আমারা বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে লিখতে ও বলতে চাই

Thursday, February 28, 2013

আমার প্রতিবাদের ভাষা

আমার প্রতিবাদের ভাষা

মাতৃভাষার শহীদদের সম্মানে, তাঁদের খুনিদের শাস্তির দাবিতে মাতৃভাষাতেই প্রতিবাদে সামিল খুদেরাও

ভাষার উদ্ভব ও প্রাচীনকালের বাংলা ভাষা

লেখকঃ মুহম্মদ মাজ্‌হারুল ইসলাম মাজ্‌হার
বর্তমানকালে আমরা যে বাংলা ভাষায় কথা বলি, প্রাচীনকালে তা কি এরূপ ছিল ? অথবা সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য, প্রাচীনকালে কেমন ছিল ? কোথা থেকে জন্মলাভ করেছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ? ইতিহাসবিদ ও তাত্ত্বিকদের সুগভীর চিন্তাভাবনা ও গবেষণা লব্ধ ফল আমাদেরকে জানতে সাহায্য করে- প্রাচীন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কথা। তবে আশঙ্কা এই যে, প্রাচীনকালে সত্যই বাংলা ভাষা-সাহিত্য কিরূপ ছিল তা আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকরা নিরূপন করতে পারেন নি। ফলে তত্ত্ব গবেষণার মাধ্যমে নানা মতের উদ্ভব হয়েছে। তর্কের দ্বারা বাতিল হয়েছে একাধিক, আবার গৃহীত হয়েছে অসংখ্য। ফলে এ বিষয়য়ে কারো মতভেদ থাকবে না যে, বাংলা ভাষা-সাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ধারার কোনো সুলিখিত প্রতিবেদন নেই। অনুমান নির্ভর ও গবেষণা লব্ধ তাত্ত্বিক ফলকেই আমরা ধরে নেই প্রমাণ বলে।
প্রচীন বাংলা সাহিত্যের কথা বলার পূর্বে যে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল- বাংলা ভাষার জন্মকথা। মূলত বাংলা ভাষা কোনো সুনির্দিষ্ট কালে জন্মলাভ করে নি। বিভিন্ন ভাষার বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে রূপলাভ করেছে বাংলায়। মূল আলোচনা ব্যতিরেকে বাংলা ভাষার জন্মকথা নিয়ে আলোচনা গৌণ হয়ে যায় বলে, সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলা ভাষার আদিরূপ ও ক্রমবিকাশ তুলে ধরছি-
হিন্দ-ইয়ুরোপায়ণ (৫০০০-৩৫০০ পূঃ খ্রীঃ অঃ)- য়ূস্‌ এক্ব্যোম স্পেক্যিএথে।
শতম (৩৫০০-২৫০০ পূঃ খ্রীঃ অঃ)- য়ূস্‌ এশ্বোম্‌ স্পেশিএথে।
আর্য (২৫০০-১৫০০ পূঃ খ্রীঃ অঃ)- য়ূস অশ্বম্‌ স্পশ্যাথ।
প্রাচীন ভারতীয় আর্য (১৫০০-১০০০ পূঃ খ্রীঃ অঃ)- য়ূয়ম অশ্বম্‌ স্পশ্যাথ।
প্রাচীন ভারতীয় আর্য কথ্য বা আদিম প্রাকৃত (১০০০-৮০০ পূঃ খ্রীঃ অঃ)- তুষ্মে ঘোটকং দৃক্ষথ। [সংস্কৃত – য়ূয়ংম (ঘোটকং) পশ্যথ]
প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত (৮০০ পূঃ খ্রীঃ অঃ – ২০০ খ্রীঃ অঃ )- তুম্‌হে ঘোটকং দেক্‌খথ। [পালি – তুমহে ঘোটকং দেক্‌খখ।]
গৌড়ি প্রাকৃত (২০০- ৪৫০ খ্রীঃ অঃ)- তুম্‌হে ঘোড়াঅং দেক্‌খহ।
গৌড় অপভ্রংশ (৪৫০- ৬৫০ খ্রীঃ অঃ)- তুম্‌হে ঘোড়অ দেক্‌খহ।
প্রাচীন যুগ (৬৫০- ১২০০ খ্রীঃ অঃ)- তুম্‌হে ঘোড়া দেখহ।
সন্ধিযুগ (১২০০-১৩৫০ খ্রীঃ অঃ)- তুম্‌হি ঘোড়া দেখহ।
মধ্য যুগ (১৩৫০- ১৮০০ খ্রীঃ অঃ)- তুম্‌হি/ তোম্‌হে ঘোড়া দেখহ।
আধুনিক যুগ (১৮০০- বর্তমান) – তুমি ঘোড়া দেখ।
বর্তমান যুগ (১৮৬০- বর্তমান)- তুমি ঘোড়া দ্যাখো।
এ থেকে স্পষ্ট হয়, হিন্দ-ইয়ুরোপায়ণ (ইন্দো-ইউরোপীয়) হল বাংলার আদি ভাষা বংশ। কিন্তু প্রশ্ন হল- ভাষা, তথা ধ্বনির উৎপত্তি হল কিভাবে ? ভাষাবিদরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন ভাষা সৃষ্টির রহস্য, এবং উদ্ঘাটন করেছেন নানা তত্ত্ব-তথ্য। উনবিংশ শতাব্দীতে মনে করা হত- প্রাকৃতিক ধ্বনি থেকে ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এর যথার্থ কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এবং এ থেকে যে তত্ত্বগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তাও ছিল মনগড়া এবং যথার্থই হাস্যকর। যেমনঃ- কুকুরের আওয়াজ থেকে ধ্বনি তৈরি হয়েছে বলে তৈরি হয় ‘ভৌ-ভৌ তত্ত্ব’, মানুষের আবেগ অনুসৃত ‘পুঃ পুঃ তত্ত্ব’, বস্তু থেকে পাওয়া অওয়াজের জন্য ‘ডিঙ-ডঙ তত্ত্ব’ ইত্যাদি ! এসব তত্ত্ব থেকে ভাষা সৃষ্টির সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও, এগুলো ভাষা সৃষ্টির আদিরূপের সন্ধান দেয়। বিংশশতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ Noam Chomsky এ সম্পর্কে মত প্রকাশ করেন- “ভাষা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। ভাষা মানুষের সৃজনী চেতনার সঙ্গে যুক্ত।” এছাড়া শরীরবিজ্ঞানের সাথে যোগসূত্র রেখে, চমস্কির অনুগামী এরিক লেনেবার্গ আরো গুরুত্বপূর্ণ মত প্রকাশ করেন-“প্রাণিজগতের বিবর্তনের মধ্যে এমন একটা মৌলিক জীবকোষগত রূপান্তর (জেনেটিক মিউটেশন) ঘটে যায়, যার ফলে মানুষ একদিন হোমো সাপিয়েন্‌স অর্থাৎ মননশীল প্রাণী হয়ে ওঠে।” এথেকে বোঝা যায় যে, আমরা যে ভাষায় কথা বলি তা আমাদের মাধ্যমেই তৈরি হয় এবং নতুন-নতুন পরিস্থিতিতে বা প্রয়োজনে আমরা ভাষার ঐ মূলনীতিগুলো ব্যবহার কোরে মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাক্য গঠন করি। একজন মানুষ তার জীবনে যতগুলো বাক্য ব্যবহার করে, তা কোনো অতীতে তাকে মুখস্ত করিয়ে দেওয়া হয় না। বস্তুত মানুষ নিজের ইচ্ছামত ভাষাকে ব্যবহার করে। প্রাচীন বাংলা সাহিত্য আলোচনা পূর্বক ভাষার উৎপত্তি ও বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশ সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া প্রয়োজন এজন্য যে- ভাষাই সাহিত্যের সৃষ্টি ও স্থির নিদান।
চর্যাপদ
বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন ‘চর্যাগীতিকোষ।’ এছাড়াও নাথগীতিকার উদ্ভব ঐ সময়েই হয়েছিল। কিন্তু ‘নাথগীতিকা’ নামক কোনো পুস্তক পাওয়া যায় নি। ‘চর্যাগিতিকোষ’ নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি আদিযুগের বাঙলা ভাষায় লেখা কয়েকজন কবির ‘গীতবিতান।’
‘চর্যাগীতিকোষ’ বা ‘চর্যাপদ’ আবিষ্কারের পূর্বে সাহিত্যের ইতিহাস লেখকেরা মনে করতেন, ময়না-মতীর গান, গোরক্ষবিজয়, শূণ্যপুরাণ, ডাক ও খনার বচন, রূপকথা ইত্যাদি প্রাচীনতম বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টান্ত। কিন্তু ১৯০৭ সালে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। প্রাচীন যুগে বৌদ্ধ তান্ত্রিক মতাবলম্বী সহজিয়া সিদ্ধাচার্যগণ বাংলা ভাষায় কিছু লিখেছেন কি-না, তা নিরূপন করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) নেপালে গমন করেন। লেপাল রাজদরবারে ‘নেপাল রয়্যাল লাইব্রেরি’ থেকে তিনি ১৯০৭ সালে প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথির সাথে বাংলা ভাষায় লেখা ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে’র পুঁথি আবিষ্কার করেন।
চর্যাপদ যে সময় লিখিত
চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ মনে করেন- ৬৫০ খ্রীঃ বাংলা সাহিত্যের আরম্ভকাল। এছাড়া ফরাসী পণ্ডিত সিলভ্যাঁ লেভির (Sylvain Levi) তাঁর Le Nepal ( Vol. I.P 347) গ্রন্থে বলেছেন- “মৎসেন্দ্রনাথ (নাথপন্থার আদি গুরু) ৬৫৭ খ্রীষ্টাব্দে রাজা নরেন্দ্র দেবের রাজত্বকালে নেপালে গমন করেন”। ফলে এটা ধারণা করা
অস্বাভাবিক নয় যে, ৬৫০ খ্রীঃ এর দিকেই বাংলা সাহিত্যের জন্ম। কিন্তু আরেকজন প্রখ্যাত ভাষাবিদ ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Origin and Development of the Bengali language (Vol I.P 122)-এ উল্লেখ করেন, “মীননাথের শিষ্য গোরাক্ষনাথের সময় খ্রীঃ ১২শ শতকের শেষে।” ফলে মীননাথ দ্বাদশ শতকের লোক। এজন্য তিনি প্রাচীনতম বাংলা রচনার কাল ৯৫০ খ্রীঃ অঃ বলে নির্দেশ করেন। এবং সুকুমার সেন সহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব পণ্ডিতই সুনীতিকুমারকে সমর্থন করেন।
চর্যাপদের ভাষা
চর্যাপদের ভাষা মূলত বাংলা। খ্রীঃ দশম শতাব্দীর দিকে বা তার সামান্য পূর্বে, যখন মাগধী অপভ্রংশ সামান্য বিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় রূপলাভ করে, সেই অপরিণত ভাষায় সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাপদগুলি রচনা করেন। এ ভাষার মূল বুনিয়াদ মাগধী অপভ্রংশ থেকে জাত প্রাচীনতম বাংলা ভাষার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এর বেশিরভাগ শব্দই মাগধী অপভ্রংশজাত। এবং একে সাধারণভাবে বাংলা ভাষা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু হিন্দি, ওড়িয়া, মৈথিল, অসমীয়া ভাষাও এর দাবীদার। ডক্টর সুকুমার সেন, অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেন, বিজয়চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ বাঙালি বিদ্বানেরাও এ মত অসত্য বলে স্বীকার করেন নি। তবে চর্যাপদের ভাষা ছিল বড় জটিল রহস্যময়। কিছুটা বোঝা গেলেও বাকিটুকু থেকে যেত অসচ্ছ। চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে ‘সান্ধ্যভাষা’ উল্লেখে মন্তব্য করেছেন- “সন্ধ্যাভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায় কতক বুঝা যায় না”। অবশ্য কবিদের এ ভাষা ব্যবহারের মূলে একটি কারণ ছিল। তা হল- চর্যাপদের কবিরা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। ফলে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতিকূল ব্যক্তি বা গোঁড়া ব্রাহ্মণ-সম্প্রদায় যাঁরা সহজিয়া বৌদ্ধদের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না, তাঁদের দৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কবিগণ এই আলোআঁধার-মেঘরোদজড়ানো রূপক ভাষা ব্যবহার করেন।
চর্যাপদের কবিতা ও কবির সংখ্যা
চর্যাপদ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য লিখিত হয় নি। মূলত বৌদ্ধ সহজযানপন্থী সহজিয়াগণ তাদের ধর্ম প্রচারের জন্য গান হিশেবে এই পদগুলি রচনা করেছিল। বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, যোগ ও নাথধর্মের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায় চর্যাপদ সৃষ্টির পিছনে। প্রতীক, রূপক ও চিত্রকল্পের ব্যবহারে বৌদ্ধ সহজযান ধর্ম, সাধনপ্রণালী, দর্শনতত্ত্ব ও নির্বাণলাভ সম্পর্কে পদ রচনা করেছেন কবিগণ। এছাড়া বাংলা, মিথিলা, উড়িষ্যা, কামরূপের সাধারণ জনগণের প্রতিদিনের ধূলি-মলিন জীবনচিত্র, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ইত্যাদি বাঙালি আবেগ বিভিন্ন কল্পনাময় রেখাচিত্রের মাধ্যমে কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
চর্যাপদের কবিগণের নাম উল্লেখ পূর্বক চর্যায় কবিতা কয়টি ছিল তা নিয়ে মতভেদটি বর্ণনা করা যেতে পারে। চর্যাপদের মোট গানের সংখ্যা সুকুমার সেনের মতে ৫১ টি। সুকুমার সেন তাঁর ‘চর্যাগীতি পদাবলী (১৯৫৬)’ গ্রন্থে প্রথমত ৫০ টি কবিতার কথা উল্লেখ করলেও সংযোজন করেছেন যে- “মুনি দত্ত পঞ্চাশটি চর্যার ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। টীকাকারের কাছে মূল চর্যার পুঁথিতে আরো অন্তত একটি বেশি চর্যা ছিল (একাদশ ও দ্বাদশ চর্যার মাধ্যখানে)। এই চর্যাটির ব্যাখ্যা না থাকায় লিপিকর উদ্ধৃত করেন নাই, শুধু ‘টিকা নাই’ এই মন্তব্যটুকু করিয়াছেন।” উল্লেখ্য যে, মুনিদত্ত ছিলেন সংস্কৃত টীকাকার। বৌদ্ধতন্ত্রে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন বলে চর্যাপদের ব্যাখ্যা হিশেবে ওই সংস্কৃত টীকার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা একান্ত আবশ্যক। সত্য বলতে, মুনিদত্তের সংস্কৃত টীকা এবং ডঃ প্রবোধচন্দ্র বাগচী কর্তৃক আবিষ্কৃত চর্যাপদের তিব্বতী অনুবাদের কারণেই আমরা চর্যার আক্ষরিক অর্থ ও গূঢ়ার্থ অনেকটা সহজে ব্যাখ্যা করতে পারি। অন্যদিকে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মতে, চর্যায় গানের সংখ্যা ৫০ টি। আসলে চর্যাপদ ছিন্নাবস্থায় পাওয়া যায় বলে এই মতান্তরের সৃষ্টি হয়েছে।
চর্যাপদে কবি সংখ্যা নিয়েও মতভেদ আছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ তাঁর ‘Buddhist Mystic Songs’ গ্রন্থে ২৩ জন কবির কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে সুকুমার সেন ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম খণ্ড)’ গ্রন্থে ২৪ জন কবির কথা উল্লেখ করেছেন। বিশিষ্ট পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন নেপাল-তিব্বতে প্রাপ্ত তালপাতার পুঁথিতে আরো করেকজন নতুন কবির চর্যাগীতি পেয়ে ‘দোহা-কোশ (১৯৫৭)’ গ্রন্থে সংযোজন করেছেন। ফলে এককথায় বলা যায়, চর্যাপদের মোট কবির সংখ্যা ২৩, মতান্তরে ২৪ জন।
চর্যাপদ কবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও পদ
চর্যাপদ কবিদের জীবনী যা জানা যায়, তা শুধুমাত্র তিব্বতী বিভিন্ন গ্রন্থাবলী থেকে। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার ভাষা বিজ্ঞানী ও ইতিহাস গবেষকরা তিব্বতী বইগুলোর জার্মান অনুবাদ থেকে চর্যাপদ গীতিকারদের জীবনী খুঁজে পেয়েছেন। যেসব তিব্বতী বইগুলোতে তাঁদের জীবনী রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- Geschichte des Buddhismus in Indien, Edelsteinmine, Die Geschichten des Vierundachtzig Zauberer (Mahasiddhas), Buddhist Philosophy in India and Ceylon, History of Buddhism in India and Tibet, Catalogue du Fonds Tibetain ইত্যাদি। এসব গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তৃত, দু’ভাবেই বৌদ্ধ সহজিয়াদের জীবন কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।
চর্যাপদ কবিদেরকে দু’ভাবে লিপিবদ্ধ করা যায়। প্রথমত, গুরু পরম্পরার ভিত্তিতে; দ্বিতীয়ত, চর্যাপদ গীতিকায় তাদের পদের অবস্থান নির্ণয়ের মাধ্যমে। প্রথমভাগের ব্যাখ্যা জটিলতর। কেননা বিভিন্ন ভাষা-ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মত রয়েছে এই গুরু পরম্পরা নিয়ে। ফলে নিম্নে চর্যাপদ গীতিকায় কবিদের লিখিত পদের অবস্থান অনুযায়ী ক্রমানুসারে চিহ্নিত করা হল-
১. লুইপা-১/২৯
লুইপা বৌদ্ধসিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদের প্রবীণ কবি, এই মত প্রকাশ করেছেন অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি। কিন্তু মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মতে, লুইপা ছিলেন শবরপার শিষ্য। তাই তিনি প্রথম কবি হতে পারেন না। তাঁর মতে লুইপা ৭৩০ থেকে ৮১০ খ্রীঃ মধ্যে জীবিত ছিলেন। লুইপা বাংলাদেশের লোক ছিলেন। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। ‘ব্‌স্তন্‌-গু্যরে শ্রীভগবদভিসময়’ নামক একটি তিব্বতী পুস্তকে তাকে বাংলাদেশের লোক বলা হয়েছে। আবার, তিব্বতী ঐতিহাসিক লামা তারনাথের মতে লুইপা পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার ধারে বাস করতেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের লোক। এবং শ্রীযুক্ত রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর এক্তি হিন্দী অভিভাষণে বলেছেন – “লূয়িপা মহারাজ ধর্মাপালকে কায়েস্থ বা লেখক থে।” লুইপা রচিত পদ দুটি- ১ ও ২৯ নং। তার রচিত সংস্কৃতগ্রস্থগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়- অভিসময় বিভঙ্গ, বজ্রস্তত্ত্ব সাধন, বুদ্ধোদয়, ভগবদাভসার, তত্ত্ব সভাব। লুইপার প্রথম পদটির দু’টি উল্লেখযোগ্য চরণ-
“কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল ।।”
আধুনিক বাংলায়ঃ “দেহ গাছের মত, এর পাঁচটি ডাল/ চঞ্চল মনে কাল প্রবেশ করে।”
২. কুক্কুরীপা > পদ নং- ২/২০/৪৮
চর্যাপদের দ্বিতীয় পদটি কুক্কুরীপা রচিত। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য অনেকে মনে করেন তিনি তিব্বতের কাছাকাছি কোনো অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। নিশ্চিতভাবে বললে কপিলসক্র। মুহঃ শহীদুল্লাহ্‌ মনে করেন, কুক্কুরীপা বাঙ্গালা দেশের লোক। তার জন্মকাল নিয়ে দ্বিধামত নেই। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে তার জন্ম। কুক্কুরীপার নাম নিয়ে অনেকে মত প্রকাশ করেছেন। ড. সুকুমার সেন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, কুক্কুরীপার ভাষার সাথে নাড়িদের ভাষাগত মিল আছে। তাই তিনি নারীও হতে পারেন। আবার তার সহচারী যোগিনী পূর্বজন্মে লুম্বিনী বলে কুক্কুরী ছিলেন বলে, তার এই নাম হয়েছে; এমতও পোষণ করেন অনেক ঐতিহাসিক। চর্যাপদে কুক্কুরীপার তিনটি বৌদ্ধগান ছিল। কিন্তু একটি অপ্রাপ্ত। ২ ও ২০ নং তার লিখিত পদ। এবং চর্যাপদে খুঁজে না পাওয়া ৪৮ নং পদটিও তার রচিত বলে ধরা হয়। কুক্কুরীপার পদযুগল ছিল গ্রাম্য ও ইতর ভাষার। কুক্কুরীপার দ্বিতীয় পদটির দু’টি উল্লেখযোগ্য চরণ-
“দিবসহি বহূড়ি কাউহি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরু জাই ।।”
আধুনিক বাংলাঃ “দিনে বউটি কাকের ভয়ে ভীত হয় / (কিন্তু) রাত হলেই সে কামরূপ যায় ।”
৩. বিরুপা > পদ নং- ৩
বিরুপা বা সংস্কৃতে বিরুপ পাদ রচনা করেছিলেন চর্যাপদের তৃতীয় পদটি। বিরুপার জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ নেই। তিনি রাজা দেবপালের রাজ্য ত্রিপুরায় জন্মেছিলেন। তবে তার জন্মসন নিয়ে সন্দেহ আছে। মনে করা হয় অষ্টম শতকে তার জন্ম। কিন্তু মুহঃ শহীদুল্লাহ্‌র মতে বিরুপা নামে দু’জন ব্যক্তি ছিলেন। একজন জয়দেব পণ্ডিতের শিষ্য, যিনি সপ্তম শতাব্দীর লোক। আর অন্য জন জালন্ধরীপার শিষ্য। ইনি বাংলার লোক। কিন্তু চর্যাপদের বিরুপার প্রকৃত গুরু ছিলেন জলন্ধরীপাদ। ফলে এখানে হেঁয়ালি রয়েছে। বিরুপা অন্যান্য কবিগণের তুলনায় সামান্য পৃথক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলন বলে জানা যায়। যেমন- তিনি মদ্যমাংসভোজনের অপরাধে বিহার থেকে বিতাড়িত হয়ে এক আশ্চর্য ক্ষমতা বলে গঙ্গা পার হয়ে উড়িষ্যার কনসতি নগরে আসেন। এবং এখানেও নানা বুজরুকি দেখান। বিরুপার ৩য় পদটি ছিল ‘শুঁড়িবাড়ি’ নিয়ে লিখিত। পদটির দুটি চরণ-
“এক সে সুণ্ডিনী দুই ঘরে সান্ধই
চীঅণ বাকলত বারুণী বান্ধই ।।”
আধুনিক বাংলায়ঃ “এক সে শুঁড়িনী দুই ঘরে সান্ধায় / চিকন বাকলেতে মদ বাঁধে।”
৪. গুণ্ডরীপা > পদ নং- ৪
গুণ্ডরীপা চর্যাপদের চতুর্থ পদটি রচনা করেন। তার নাম নিয়ে মতভেদ আছে। কার্দিয়ার ক্যাটালগে তার এই নাম পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন গুণ্ডরীপা তার বৃতি বা জাতিবাচক নাম। যেমন- এ যুগের কর্মকার বা সরকার। প্রথমত তিনি বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের কবি বলে জ্ঞাত হলেও, অনেকে মনে করেন তিনি বিহারের লোক। রাজা দেবপালের রাজত্বকালে (৮০৯-৮৪১) সময়ের মধ্যে তিনি বর্তমান ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। তার চার নং পদের দু’টি চরণ-
“জোইনি তইঁ বিনু খনহিঁ ন জীবমি।
তো মুহ চুম্বী কমল রস পিব্‌মি ।।”
আধুনিক বাংলাঃ “রে যোগিনী, তুই বিনা ক্ষণকাল বাঁচি না / তোর মুখ চুমিয়া কমল রস পান করি।”
৫. চাটিল্লপা > পদ নং- ৫
চাটিল্লপা সম্পর্কে বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। অনেকে মনে করেন, পাঁচ নং পদটি তার শিষ্যের রচিত। জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুরের বর্ণ-রত্নাকরে চাটিল্লের নাম লিপিকর প্রমাদে চাটল রয়েছে। তিনি ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের কাছে দক্ষিণবঙ্গের অধিবাসী হিশেবে জীবিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তার পদে নদীমাতৃক অঞ্চলের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। যেমনঃ নদী, সাঁকো, কাদা, জলের বেগ, গাছ, খনন করা ইত্যাদি। সহজ সাধনভজন তত্ত্বকথা এসবের আলোকেই ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
৬. ভুসুকুপা > পদ নং- ৬/২১/২৩/২৭/৩০/৪১/৪৩/৪৯
পঞ্চাশটি চর্যা-পদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক রচনা করেন কাহ্নপা। এবং তার পরেই ভুসুকুপার স্থান। তিনি মোট আটটি পদ রচনা করেন। তার নাম নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে। মনে করা হয়, তার আসল নাম শান্তিদেব। সুম্‌পা ম্‌খন্‌-পো (১৭৪৭ খ্রীঃ অঃ) তার দ্‌পদ্‌-ব্‌-সম-লজোন্‌-বজন্‌ বইয়ে ভুসুকু সম্পর্কে বলেছেন- “ভুসুকু অষ্টম থেকে এগার শতকের মধ্যে সৌরাষ্ট্রের রাজা কল্যাণবর্মার পুত্র ছিলেন। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম শান্তিবর্মা ছিল।” এজন্য তাকে শান্তিদেব নামেও ডাকা হয়। বৌদ্ধাচার্য জয়দেব ভুসুকুকে শিক্ষাসমুচ্চয়, সূত্রসমুচ্চয় ও বোধিচর্যাবতার নামক তিনটি বই দেন। ভুসুকু নিজের আবাসে একমনে লেখাপড়া করতেন বলে অন্য ভিক্ষুরা তাকে অলস মনে করত। এজন্য তারা তাকে উপহাস কোরে ভুসুকু নামে ডাকত। যেখানে, ভু অর্থ ভুক্তি (ভোজন), সু অর্থ সুপ্ত (শয়ন/নিদ্রা), কু অর্থ কুটির ! ভুসুকুপা বাঙালি ছিলেন। অনুমান করা হয় তিনি পূর্ব বাংলা কবি। তার পদে বাংলার বিভিন্ন চিত্র উজ্জ্বলভাবে ফুঁটে উঠেছে। তার ৪৯ চর্যাটির চারখানা চরণ হল-
“বাজনাব পাড়ী পঁউআ খাঁলে বাহিউ
অদব বঙ্গাল দেশ লুড়িউ ।।
আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী,
নিঅ ঘরিণী চণ্ডালেঁ লেলী ।।”
আধুনিক বাংলায়ঃ “ বজ্ররূপ নৌকায় পাড়ি দিয়া পদ্মার খালে বাহিলাম। / অদ্বয়রূপ বাঙ্গালা দেশ লুঠ করিলাম। / হে ভুসুকু, আজি বাঙ্গালিনী জন্মিলেন। / চণ্ডালে (তোমার) নিজ গৃহিনীকে লইয়া গেল”।
[ বাকি অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে। ]
তথ্যসূত্রঃ
১. বাংলা সাহিত্যের কথা – মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌
২. বঙ্গভাষা ও সাহিত্য- দীনেশচন্দ্র সেন
৩. বৌদ্ধ ধর্ম ও সাহিত্য- প্রবোধচন্দ্র বাগচী
৪. প্রাচীন বাঙলা সাহিত্যের কালক্রম- সুখময় মুখোপাধ্যায়
৫. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত- ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৬. কতো নদী সরোবর- হুমায়ুন আজাদ
৭. সাহিত্য ও সংস্কৃতি চিন্তা- আহমদ শরীফ
৮. লাল নীল দীপাবলি- হুমায়ুন আজাদ
৯. বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা- সৌমিত্র শেখর
১০. ভাষার ইতিবৃত- সুকুমার সেন
১১. The Origin and Development of the Bengali language- C. Suniti Kumar
১২. ভাষা-শিক্ষা – হায়াৎ মামুদ

মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা

 
মো. মহিবুল্লাহ, ২১ ফেব্রুয়ারীঃ
বাঙালী হিসেবে খুব অল্প যে কয়টা বিষয় নিয়ে আমরা দল-মত নির্বিশেষে গর্ব করে থাকি, আমাদের প্রিয় “বাংলা ভাষা” এবং এই ভাষার জন্য আমাদের পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে অন্যতম। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ও তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সুবাদে আমাদের মায়ের ভাষাটি বিশ্বজুড়ে বেশ পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার পর থেকে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ২১ ফেব্রুয়ারী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর চতুর্থ (ভাষকসংখ্যার দিক থেকে সপ্তম) অবস্থানে থাকা ভাষাটির আশানুরূপ প্রভাব আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমরা এখনও পর্যন্ত সেভাবে তৈরি করতে পারি নি। যোগাযোগের আধুনিকতম মাধ্যম ইন্টারনেটেও বাংলা ভাষার দখল খুব সমৃদ্ধ নয়। এর একটা অন্যতম কারণ, বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করতে আমরা যতটা আগ্রহী, এর প্রচার-প্রসারে ততোটা নই! আশার কথা, সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে বাংলা ওয়েবসাইটের সংখ্যাও। কাগজে-কলমে ও ছাপার হরফে মলাটবন্দী হওয়ার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা হচ্ছে ব্লগেও। তবে শুধুই ব্যবহারে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রিয় ভাষাটির ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা ও সেগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়াটা প্রতিটি বাঙালীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। 

যেভাবে এলো “বাংলা ভাষা”
বাংলা  দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বপ্রান্তের একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। এক হাজার খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর বিভিন্ন অপভ্রংশ থেকে বেশ কয়েকটি আধুনিক ভারতীয় ভাষার উদ্ভব ঘটে। এগুলোর মধ্যে মাগধি অপভ্রংশ মতান্তরে গৌড়ি অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত তৎকালীন “বঙ্গ” বা “বঙ্গাল” মুলুকের অধিবাসীদের কথোপকথনের ভাষাটিই “বাঙালা” নাম লাভ করে যা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিবর্তন পেরিয়ে এখন আধুনিক “বাংলা” ভাষা হিসেবে আমরা ব্যবহার করছি।
বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বা ভাষারীতি রচিত হয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। পর্তুগীজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্য আসসুম্পসাঁউ Vocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes নামে বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ও অভিধান রচনা করেন। পরবর্তীতে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হেলহেড নামক এক ইংরেজ প্রাচ্যবিদ ও বাঙালীদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় কথা বলার ও লেখার নিয়ম-কানুনকে সাংবিধানিক রূপ দেন। আধুনিককালে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডঃ সুকুমার সেন, মুনীর চৌধুরী, ডঃ হুমায়ূন আজাদসহ বহু পণ্ডিত-ভাষাবিদের সংস্পর্শে বাংলা ভাষার রীতিনীতি, ব্যবহারবিধি প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ ও গতিশীল হয়েছে।
স্বীকৃতির জন্য যত আন্দোলন
সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন ইংরেজ পণ্ডিত ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হেলহেড। ১৭৭৮ সালে তাঁর লেখা “এ গ্রামার অব দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ” বইয়ে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রভাষা ফার্সির পরিবর্তে বাংলা করা হলে ব্রিটিশ কোম্পানি সরকারের সুবিধা হবে বলে মত প্রকাশ করেন। এর প্রায় দেড়শ বছর পর ১৯১৮ সালে শান্তিনিকেতনে এক আলোচনা সভায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বাঙালী হয়ে ভারতবর্ষের সাধারণ ভাষা হিসেবে হিন্দীকে অগ্রাধিকার দেন। ওই বছর মহাত্মা গান্ধীকে পাঠানো এক চিঠিতেও তিনি একই মনোভাব ব্যক্ত করে লিখেন, “The only possible national language for intercourse is Hindi in India”. (সূত্র : রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী—প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৬৮, পৃঃ ৭৮); এর প্রতিবাদ জানিয়ে তখনই ভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাকে ভারতবর্ষের সাধারণ ভাষা করার দাবী তোলেন। ১৯২১ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়াশুনার ভাষা করার দাবী জানিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি দেন। পরবর্তীতে মওলানা আকরম খাঁ, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবুল মনসুর আহমেদসহ অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে রাষ্ট্রভাষার বাংলার দাবীতে লেখালেখি ও বক্তৃতা-বিবৃতি অব্যাহত রাখেন। তবে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবার দাবীটি সাধারণ জনগণের হয়ে ওঠে ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তান সৃষ্টির পর। পাকিস্তান ট্রাস্ট সিভিল সার্ভিসের একটি গেজেটে উর্দু, হিন্দী, তুর্কি, ল্যাটিন ও সংস্কৃত মোট পাঁচটি ভাষা ব্যবহৃত হলেও বাদ পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা। বিষয়টি তুলে ধরে তৎকালীন ইত্তেহাদ পত্রিকায় একটি প্রতিবাদী কলাম লিখেন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি বলে বিবেচিত প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাশেম। বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে লেখাটি ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তরুণ সমাজ, শুরু হয় মায়ের ভাষার মর্যাদা আদায়ের এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। এক বছর পর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্তির দাবী তোলেন ভাষা আন্দোলনের আরেক স্থপতি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। মুসলিম লীগের বিরোধিতায় এ দাবী বাতিল হয়ে গেলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। চলতে থাকে ধারাবাহিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। টানা পাঁচ বছর সংগ্রামের পর ১৯৫২ সালে তা চরম আকার ধারণ করে। এ বছরের শুরু থেকেই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। প্রায় প্রতিদিন সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল আর স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান। অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে পাকিস্তান সরকার ঢাকা শহরে সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে, কড়া নজরদারীতে রাখা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২ (বাংলা ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮ সন) তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ গেট) মিলিত হন। তিন ঘণ্টা সেখানে অবস্থানের পর উপস্থিত ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদ (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) অভিমুখে মিছিল বের করলে পুলিশ বাঁধা দেয় ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঘটনাস্থলেই মারা যান আবুল বরকত (ঢাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র),  রফিক উদ্দীন ও আব্দুস সালাম নামে তিন তরুণ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আরও কয়েকজনের। শোকাবহ এ ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো, স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে সব বয়সের, শ্রেণী-পেশার মানুষ, অবাক পৃথিবী অগাধ বিস্ময় নিয়ে সাক্ষী হয় ভাষার জন্যে একটি জাতির সীমাহীন আবেগ আর ভালোবাসার! ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার শেষপর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়। ভাষার প্রতি বাঙালীর এই আবেগ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং স্ব-স্ব মাতৃভাষার প্রতি পৃথিবীজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে জাতিসংঘের সহযোগী সংগঠন ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থেই আরও একটি রক্তঝরা আন্দোলন হয়েছিল আসামে। অসমিয়া ভাষার আগ্রাসন থেকে নিজেদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দেন সেখানাকার বাঙালীরা। আসামের প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামে সকাল-সন্ধ্যা ধর্মঘটের ডাক দিয়ে শিলচরের একটি রেলস্টেশনে রেলপথ অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা। এসময় নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাঁদের সংঘর্ষ শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে আসাম রাইফেলস গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই  প্রাণ হারান নারীসহ অন্তত ১১ জন ভাষাবিপ্লবী, আহত হন অর্ধশতাধিক। সৃষ্টি হল বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের আরেকটি ইতিহাস। এবারেও বাঙালীর আত্মত্যাগ বৃথা যায় নি, আসাম সরকার বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।
ভৌগোলিক বিস্তৃতি
বাংলা দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বভাগের বঙ্গ বা বাংলা নামক অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা। এ অঞ্চলটি বর্তমানে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে বিভক্ত। বাংলাদেশের প্রায় ৯৮% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এর বাইরে বহির্বিশ্বে প্রবাসী কিংবা অভিবাসী হিসেবে অবস্থানরত বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যাও প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলাভাষীরা প্রথম সারিতেই অবস্থান করছেন। সবমিলিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা ইতোমধ্যে তিরিশ কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে আশা করা যায়।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র বাংলাদেশের একমাত্র স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এছাড়াও ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম।ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা বাংলা, আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার তিন জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে স্বীকৃত সরকারি ভাষা বাংলা। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেরও অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা বাংলা। এদের বাইরে আফ্রিকান রাষ্ট্র সিয়েরালিওন সে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিসরূপ বাংলাকে তাঁদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার
এত রক্ত আর প্রাণের দামে কেনা অমূল্য ভাষাটির সম্মান, মর্যাদা আমরা কতটুকু ধরে রাখতে পারছি সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। পৃথিবীর অনেক দেশই এখন নিজেদের মাতৃভাষায় রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান চর্চা সবই করছে। অথচ ভাষার জন্যে জীবন দিয়ে দেয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত শুধু বাংলাভাষীদেরই আছে। এমন একটি ভাষা শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি নিয়ে পড়ে থাকাটা খুবই দুঃখজনক! সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইন পাশ হয় ১৯৮৭ সালে। কিন্তু তা এখনও ফাইলবন্দীই রয়ে গেছে। প্রশাসন, শিক্ষাক্ষেত্র ও অফিস-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচলন করতে হলে প্রচলিত আইনসমূহের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন এবং প্রয়োজন মত নতুন আইন, বিধি ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা আবশ্যক। এ ব্যাপারে সরকারের যথেষ্ট সদিচ্ছার পাশাপাশি জনগণেরও তরফেও স্বতঃস্ফূর্ত দাবী আসা দরকার।
তবে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি দেশের অধিবাসী হিসেবে এখনই মাতৃভাষায় পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ার চিন্তাটা আমাদের জন্যে বিলাসিতাই বটে! বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজী ভাষার এখনও পর্যন্ত কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসে কর্মরত জনশক্তি। অত্যধিক জনসংখ্যার এই দেশে মানবসম্পদই আমাদের মূল সম্পদ। এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার পাশপাশি ভাষাজ্ঞানেও যথেষ্ট শিক্ষিত করে তোলা আবশ্যক। মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক জায়গাতেই শুধুমাত্র ভালো ইংরেজি না জানার কারণে আমাদের শ্রমিকরা যোগ্যতা অনুসারে কাজ বা অর্থ পাচ্ছেন না। এ দিকটিতে বিশেষভাবে নজর দেয়া জরুরী। সুতরাং, সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের দাবী যেন কোনভাবেই আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি শিক্ষার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়।
শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় ভাষণ প্রদান আমাদের গর্বিত করে। বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার জোর দাবী উঠেছে এবং তা বাস্তবায়নেও কাজ করে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বিশ্বে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরাশক্তি না হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘে বাংলার আনুষ্ঠানিক স্থান করে নেয়াটা আদতে কতটুকু সম্ভব হবে সেটা সময়ই বলে দেবে, তবে বাংলাদেশ সরকার ও প্রবাসী বাঙালীদের এই আন্তরিক প্রচেষ্টাটুকুই বিশাল সাধুবাদ পাবার দাবী রাখে।
অবাধ তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেটেও বাড়ছে বাংলা ভাষার ব্যবহার। এক্ষেত্রে প্রথম বাংলা টাইপিং সফটওয়্যার “বিজয়”-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বাংলা ভাষার প্রচলনে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন এ কালের ভাষা সৈনিক মেহেদী হাসান খান। ২০০৩ সালে তাঁর আবিষ্কৃত বিনামূল্যের মুক্ত সফটওয়্যার “অভ্র কী-বোর্ড”ই এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বাংলা লেখার নিত্যসঙ্গী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এখন বেশিরভাগ বাংলাদেশীই বাংলায় লিখছেন। বাংলা ব্লগিংও এখন যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ওয়েব পোর্টালের সংখ্যাও দিনদিন বাড়ছে। গুগল, ফেসবুকসহ অনেক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট এখন সম্পূর্ণ বাংলাতেই ব্যবহার করা যাচ্ছে। সেচ্ছাসেবী বাঙালীদের নিরলস প্রচেষ্টায় খুব দ্রুতই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বাংলা উইকিপিডিয়া কিংবা গুগল ট্রান্সলেটরের মতো অত্যন্ত কার্যকর অনলাইন সেবাসমূহ।
বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে বিখ্যাত হয়েছেন এবং একই সাথে বাংলা ভাষাকেও ধন্য করেছেন এমন ব্যক্তিবর্গের তালিকাটা নেহায়েত ছোট হবে না। কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি এ ভাষার রত্নভাণ্ডারকে প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করে চলেছে এ কালের প্রজন্মও। তবে বাংলা চলচ্চিত্র, টিভি নাটক ও এ ধরণের অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট মান এখনও পর্যন্ত খুব একটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এই দিকটিতে মেধাবীদের এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়াটা জরুরী। অতি সম্প্রতি জাপানি ভাষার একটি কার্টুন ধারাবাহিক “ডরেমন”-এর হিন্দী সংস্করণ বাচ্চাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় তা আগ্রাসনের রূপ নিলে বাধ্য হয়ে সরকার বাংলাদেশে এটির সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। অথচ কার্টুনটি বাংলা ভাষায় ডাবিং করে প্রচারের দাবীটি দাবীই থেকে যায়। মাথা ব্যাথার প্রতিকার যেন এভাবে মাথা কেটে ফেলা না হয় সেদিকেও ভবিষ্যতে খেয়াল রাখতে হবে।
অবাধ ব্যবহারের ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাষার বিকৃতিও হচ্ছে অনেক। যুগের দাবীতে চালু হওয়া এফএম বেতার ও মোবাইল ফোনের সংক্ষিপ্ত বার্তা (এসএমএস) আদান-প্রদানে ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। যদিও ভাষাকে বলা হয় প্রবাহমান নদীর মতো এবং একে বাঁধ দিয়ে রাখার যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক চলতে পারে, তারপরও ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর প্রমীত রূপটা যতটুকু সম্ভব ধরে রাখা জরুরী। এক্ষেত্রে আইন-আদালতের চেয়ে ব্যবহারকারীদের সচেতনতাটাই অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মায়ের ভাষায় মনের ভাব প্রকাশে যতটা শান্তি ও আনন্দ পাওয়া যায়, অন্য কোন ভাষায় তা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তথাপি জন্মসূত্রেই এত দামী আর মর্যাদাপূর্ণ একটি ভাষার অধিকারী হয়ে যাওয়াটা যথেষ্টই ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু তারপরও একটা অভিযোগ অনেকদিন ধরেই উঠছে যে ফেব্রুয়ারী মাস এলে বাঙালী যতটা ভাষাপ্রেমী হয়ে ওঠে, অন্যান্য মাসে সেটা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। এ ব্যাপারে আমাদের আরও সজাগ হওয়াটা জরুরী। এছাড়া প্রতিনিয়ত আবিষ্কার হওয়া নিত্যনতুন প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে প্রিয় বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ভাণ্ডারকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাটাও এমন একটি ভাষার ধারক-বাহকদের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজেদের স্বাভাবিক কাজকর্মের ফাঁকে একটু একটু করে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে সচেষ্ট হই, তাহলে কাজটা মোটেও কঠিন কিছু নয়। সবসময় মনে রাখা উচিৎ এই ভাষাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সুতরাং এর সমৃদ্ধি, উন্নতি ও স্বীকৃতি মানেই আমাদের সমৃদ্ধি, উন্নতি ও স্বীকৃতি। চলুন না ভাষা আন্দোলনের ষাট বছরে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকেই একেকজন একালের ভাষাসৈনিক হবার শপথ নেই! মাতৃভাষার শুদ্ধ ও প্রমীত ব্যবহার নিজে জানি, অন্যকে জানাই; মায়ের ভাষার রূপ, ঐশ্বর্য পৃথিবীর শত কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হই। বিশ্বাস রাখুন, কোনরূপ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ছাড়াই এই আমি-আপনি, আমরাই পারি আমাদের প্রাণের ভাষা, মায়ের ভাষা বাংলাকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে!

হুল ফোটানোর ছড়া : আ মরি বাংলা ভাষা!

হা সা ন হা ফি জ



বাংলা কওয়ার মাস একটাই
ফেব্রুয়ারি-গন
হিন্দি আবার অন।
পড়শি দ্যাশের মিষ্ট ভাষা
কাইড়া যে নেয় মন—
দোষ কী আমার কন!

হিন্দি চ্যানেল বড়ই প্রিয়
এ্যায়সা কিউ কিয়া
দিল আনচান করতে থাকে
হয় বেচঈন হিয়া—
বাংলা বুলি ভুল গ্যায়া ম্যায়
ইশ কী আলোড়ন
বাংলা ভাষার মাস পেরোলো
পায়নি এ্যাটেনশন!
http://www.google.com.bd/url?sa=t&rct=j&q=&esrc=s&source=web&cd=12&ved=0CDoQFjABOAo&url=http%3A%2F%2Fwww.ojana.info%2Ftag%2F%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25BE-%25E0%25A6%25AD%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B7%25E0%25A6%25BE%2F&ei=cUswUf61FMnWrQfm6oCYBg&usg=AFQjCNEqoc59EI_8I98FbD4xHWsdYN58_A&sig2=A6ULbJ6Hf8-4zfFnX1vWTQ&bvm=bv.43148975,d.bmk

ভাষা, বাংলা ভাষা ও বাংলা ভাষারীতি

ভাষা
বাগযন্ত্র
ধ্বনি
কণ্ঠধ্বনি
ভাষা
বাংলা ভাষা
বাংলা ভাষারীতি
প্রমিত চলিত ভাষারীতি
আঞ্চলিক কথ্য রীতি
সাধু রীতি
ভাষারীতিগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (ছক)
সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য (ছক)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত বছরের প্রশ্ন


ভাষা

ভাষার সংজ্ঞা বলার আগে আরো কিছু সংজ্ঞা জানা জরুরি।

বাগযন্ত্র: মানুষ কথা বলার সময় শরীরের যে সমস্ত অঙ্গ ব্যবহার করে, সেগুলোকেই একত্রে বাগযন্ত্র বলে। মানুষের বাগযন্ত্রের মধ্যে আছে- গলনালী, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দন্ত বা দাঁত, নাসিকা বা নাক, ওষ্ঠাধর বা ঠোঁট, ইত্যাদি।

ধ্বনি: যে কোনো ধরনের আওয়াজকেই ধ্বনি বলা হয়। যেমন, মানুষের ভাষার ক্ষুদ্রতম ধ্বনি, বন্দুকের ধ্বনি, নূপুরের ধ্বনি, বজ্রপাতের ধ্বনি, গিটারের ধ্বনি, ড্রামসের ধ্বনি, কীবোর্ডে টাইপ করার ধ্বনি, ইত্যাদি।

কণ্ঠধ্বনি: মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে যে ধ্বনি সৃষ্টি করে, তাকে কণ্ঠধ্বনি বা ভাষণধ্বনি বলে। এটিই আমাদের ব্যাকরণের আলোচ্য ধ্বনি। ব্যাকরণে আমরা ‘ধ্বনি’ বলতে এই কণ্ঠধ্বনি বা ভাষণধ্বনিকেই বুঝিয়ে থাকি।

এই ধ্বনিই ভাষার মূল উপাদান।

ভাষা: বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকেই ভাষা বলে। এই ভাষা বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন জাতির ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের জন্য বিভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের বাঙালি সংস্কৃতির অধিকারী বাঙালিরা বাংলা ভাষায় কথা বলে। আবার বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে।

বর্তমানে পৃথিবীতে ভাষা আছে প্রায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি (৩৫০০-রও বেশি)।

বাংলা ভাষা

বাঙালি সংস্কৃতির অধিকারী বাঙালি জাতি যে ভাষায় তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে, সেটিই বাংলা ভাষা।

ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর ৪র্থ বৃহৎ মাতৃভাষা। বর্তমানে, বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি।

বাংলা ভাষাভাষীরা থাকে- বাংলাদেশে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, এবং ভারতের ত্রিপুরা, উড়িষ্যা, বিহার ও আসামের কিছু অংশে। তবে এখন প্রবাসী বাংলাদেশি ও প্রবাসী ভারতীয় বাঙালিদের কল্যাণে পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ থাকে।

বাংলা ভাষারীতি

ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। প্রতিটি মুহুর্তে ভাষা একটু একটু করে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিটি ভাষাভাষী লোকজন তাদের ভাষার কঠিন শব্দটিকে পাল্টে সহজ করে নিচ্ছে, ছোট করে নিচ্ছে, আবার প্রয়োজনে অন্য ভাষা থেকে নতুন নতুন শব্দ গ্রহণ করছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে নানা কৌশল প্রয়োগ করে নতুন নতুন শব্দও তৈরি করছে। এমনকি পুরোনো কোনো শব্দ নতুন অর্থে ব্যবহার করেও শব্দটির নতুন অর্থদ্যোতকতা তৈরি করে নতুন শব্দ তৈরি করা হচ্ছে। বাংলা ভাষায় এই কৌশলে নতুন অর্থপ্রাপ্ত বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দ হচ্ছে- কঠিন ও চরম।

ভাষার এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই একদিন অপভ্রংশ থেকে জন্ম নিয়েছিলো আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। আবার এই পরিবর্তনের কারণে বাংলা ভাষায় কিছু পৃথক ভাষারীতিও জন্ম নিয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত বাংলা ভাষারীতি ২টি- আঞ্চলিক কথ্য রীতি ও প্রমিত চলিত ভাষারীতি।

প্রমিত চলিত ভাষারীতি: দেশের সকল মানুষ যে আদর্শ ভাষারীতিতে কথা বলে, যেই ভাষারীতি সকলে বোঝে, এবং যে ভাষায় সকলে শিল্প-সাহিত্য রচনা ও শিক্ষা ও অন্যান্য কাজকর্ম সম্পাদন করে, সেটিই প্রমিত চলিত ভাষারীতি। এই ভাষায় যেমন সাহিত্য সাধনা বা লেখালেখি করা যায়, তেমনি কথা বলার জন্যও এই ভাষা ব্যবহার করা হয়। সকলে বোঝে বলে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে, যেমন কোনো অনুষ্ঠানে বা অপরিচিত জায়গায় বা আনুষ্ঠানিক (formal) আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্রে এই ভাষারীতি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, এই রীতি লেখ্য ও কথ্য উভয় রীতিতেই ব্যবহৃত হয়।

বাংলা প্রমিত চলিত ভাষারীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভাগীরথী-তীরবর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষার উপর ভিত্তি করে। তবে, পূর্বে এই ভাষা সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। তখন কেবল সাধু ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করা হতো। এ কারণে বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও ছোটগল্পকাররা সাধু ভাষায় উপন্যাস, নাটক ও গল্প লিখেছেন। পরবর্তীতে, প্রমথ চৌধুরী চলিত রীতিতে সাহিত্য রচনার উপর ব্যাপক জোর দেন এবং তাঁর ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) পত্রিকার মাধ্যমে চলিত রীতিতে সাহিত্য রচনাকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

আঞ্চলিক কথ্য রীতি: বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজেদের মধ্যে যে বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাকেই আঞ্চলিক কথ্য রীতি বা আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা বলে। সকল ভাষাতেই আঞ্চলিক ভাষা থাকে। এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষায় অনেক পার্থক্য দেখা যায়। এগুলো কোনোভাবেই বিকৃত ভাষা নয়, এগুলো শুদ্ধ ও প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক ভাষারীতি।

প্রকৃতঅর্থে, প্রমিত চলিত ভাষারীতিও একটি অঞ্চলের কথ্য রীতির উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কেবল- ভাগীরথী-তীরবর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষাকে তখন প্রমিত ভাষারীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অন্যগুলোকে প্রমিত ভাষারীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

তবে আঞ্চলিক কথ্য রীতি লেখ্য ভাষা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, সেটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়, সকল অঞ্চলের মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বুঝবে না। তবে কোনো অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কোনো সাহিত্য রচিত হলে সেখানে আঞ্চলিক ভাষা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। সম্পূর্ণ বা পুরোটুকুই আঞ্চলিক ভাষায় রচিত একটি শিল্পসম্মত উপন্যাস হলো হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’।


বাংলা ভাষায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষারীতি আছে; যেটি এখন মৃতপ্রায়, আর ব্যবহৃত হয় না- সাধু ভাষারীতি বা সাধু রীতি।

সাধু রীতি: পূর্বে সাহিত্য রচনা ও লেখালেখির জন্য তৎসম শব্দবহুল, দীর্ঘ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সম্পন্ন যে গুরুগম্ভীর ভাষারীতি ব্যবহৃত হতো, তাকেই সাধু ভাষা বলে। এই ভাষা অত্যন্ত গুরুগম্ভীর, দুরূহ এবং এতে দীর্ঘ পদ ব্যবহৃত হয় বলে এই ভাষা কথা বলার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক না। তাই এই ভাষায় কথাও বলা হয় না। এই ভাষা কেবল লেখ্য রীতিতে ব্যবহারযোগ্য। তাও বহু আগেই লেখ্য রীতি হিসেবে চলিত রীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় সাধু রীতি এখন লেখ্য ভাষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয় না। কেবল সরকারি দলিল-দস্তাবেজ লেখা ও অন্যান্য কিছু দাপ্তরিক কাজে এখনো এই রীতি ব্যবহৃত হয়।

নিচে বাংলা ভাষারীতিগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো:
আঞ্চলিক কথ্য রীতি
প্রমিত চলিত রীতি
সাধু রীতি
বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা
সকলের দ্বারা স্বীকৃত সাহিত্য রচনা, আলাপ-আলোচনা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ভাষারীতি
পূর্বে সাহিত্য রচনা ও লেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত গুরুগম্ভীর ও দুরূহ ভাষারীতি
শুধু কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়
কথ্য ও লেখ্য উভয় মাধ্যমেই বহুল ব্যবহৃত
শুধু লেখ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়
নির্দিষ্ট অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত; সকল স্তরে ব্যবহৃত হয়
বর্তমানে ব্যবহৃত হয় না
উপভাষা/নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা
সর্বজনস্বীকৃত আদর্শ চলিত রূপ
সর্বজনস্বীকৃত লেখ্য রূপ

নিচে সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্যগুলো সংক্ষেপে দেয়া হলো:
চলিত ভাষা
সাধু ভাষা
তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ বেশি ব্যবহৃত হয়। গুরুগম্ভীর তৎসম শব্দ যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া হয়।
যেমন- রক্ষা(পরিত্রাণ), সঙ্গে(সমভিব্যাহারে), তীর সংযোগ(শরসন্ধান), আমগাছের নিচে(সহকার তরুতলে)
তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ বেশি ব্যবহৃত হয়।
যেমন- পরিত্রাণ(রক্ষা), সমভিব্যাহারে(সঙ্গে), শরসন্ধান(তীর সংযোগ), সহকার তরুতলে (আমগাছের নিচে)
সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সহজ ও সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়, যেটি উচ্চারণ ও ব্যবহার করা আরামদায়ক ও সহজ।
যেমন- তার(তদীয়), এরা(ইহারা), আপনার(আপনকার), তাদের(তাহাদিগকে)
হলে(হইলে), লাগিলেন(লাগলেন), জিজ্ঞাসিলেন(জিজ্ঞাসা করলেন)
সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের দীর্ঘ পূর্ণাঙ্গ রূপ ব্যবহৃত হয়।
যেমন- তদীয়(তার), ইহারা(এরা), আপনকার(আপনার), তাহাদিগকে(তাদের)
হইলে(হলে), লাগলেন(লাগিলেন), জিজ্ঞাসা করলেন(জিজ্ঞাসিলেন)
অপেক্ষাকৃত সহজ বিশেষণ পদ ব্যবহার করা হয়।
যেমন- অত্যন্ত(অতিমাত্র), এরূপ(এ রকম), এইরকম(ঈদৃশ), মাদৃশ(আমার মতো), এই অনুযায়ী(এতদনুযায়ী)
অপেক্ষাকৃত কঠিন, দীর্ঘ (বিশেষত তৎসম) বিশেষণ পদ ব্যবহার করা হয়।
যেমন- অতিমাত্র(অত্যন্ত), এ রকম(এরূপ), ঈদৃশ(এইরকম), আমার মতো(মাদৃশ), এতদনুযায়ী(এই অনুযায়ী)
সন্ধি ও সমাসবদ্ধ পদকে প্রায়ই ভেঙে ব্যবহার করা হয়।
যেমন-  বনের মধ্যে (বনমধ্যে), ভার অর্পণ (ভারার্পণ), প্রাণ যাওয়ার ভয় (প্রাণভয়)
সন্ধি ও সমাসবদ্ধ পদ বেশি ব্যবহার করা হয়।
যেমন- বনমধ্যে (বনের মধ্যে), ভারার্পণ (ভার অর্পণ), প্রাণভয় (প্রাণ যাওয়ার ভয়)

* উল্লেখ্য, সাধু ও চলিত রীতিতে কেবলমাত্র অব্যয় পদ অপরিবর্তিতভাবে ব্যবহৃত হয়। সাধু ও চলিত রীতি ভেদে অব্যয় পদের কোনো পরিবর্তন হয় না। এছাড়া আর প্রায় সবধরনের পদ-ই পরিবর্তিত হয়। এমনকি কিছু কিছু অনুসর্গও সাধু ও চলিত রীতিতে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত বছরের প্রশ্ন
  • সাধু ও চলিত রীতিতে অভিন্নরূপে ব্যবহৃত হয়Ñ (ক-২০০৬-০৭)
  • বাংলা কোন রীতি এখন বহুল প্রচলিত- (ঘ-২০০০-০১)

আকাশ পাতাল

বাংলা ভাষা

উল্লাস মল্লিক

আরও একটা চলে গেল। মানে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বড় চুপি চুপি, যেন মাথা হেঁট করে, চলে গেল। জানতেই পারল না অনেকে। যারা জানতে পারল, তারা বুঝতে পারল না এর গৌরবগাথা। আর যারা সম্যক বুঝল, তারা সংখ্যায় এত গুটিকয় মাত্র, তাদের সমবেত স্লোগান এত ক্ষীণ, যে বধির বাঙালির বন্ধকপাট খুলতেই পারল না। আমাদের মনে-মগজে কত তাবড় তাবড় ব্যাপার গুলতোল করে ঘাই দিচ্ছে অহর্নিশ! শেয়ার মার্কেটের উত্থান-পতন, আমেরিকার আগ্রাসন, পাকিস্তানের সঙ্গে রাগ-অনুরাগ, নতুন গ্রহে প্রাণের সন্ধান – কত সব প্রলয়কারী কাণ্ড! সঙ্গে পার্কস্ট্রিট কেলেঙ্কারি, সচিনের অফ ফর্ম, দীপিকা পাডুকোনের বিরহ – সব কিছুর এমন প্রবল সাইক্লোন, যে এই দুয়োরানি দিবসটা খড়কুটোর মতো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
চারদিকে এখন ইংরেজির তুমুল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। সঙ্গে হিন্দির সঙ্গত। ইস্কুল-কলেজে, মাঠে-ময়দানে, বাসে-ট্রামে, দোকানে-বাজারে বাংলা বেচারা প্রাণপণে মুখ লুকোচ্ছে। কিছু কিছু জায়গা আছে, সত্যি বলতে কী, যেখানে বাংলা বলতে বুক কাঁপে। শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, কেতাদুরস্ত রেস্তোরাঁয় মনে হয় বাংলা বললে নির্ঘাত ঘাড় ধরে বের করে দেবে। মেট্রোর সিটে হাতে সস্তা ইংরেজি পেপার ব্যাক ধরে থাকলে লোকে আড়াই ইঞ্চি সরে বসে। দোকানে ঢুকে ইংরেজিতে দাম জিঞ্জেস করলে সেলসম্যান অন্য খদ্দের ছেড়ে পড়িমড়ি করে এগিয়ে আসে। না ইংরেজি জানা চরিত্রের একটা মস্ত কলঙ্ক – এমন বলছি না। বরং ভীষণ জরুরি একটা প্রয়োজন। বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু তার জন্যে মাতৃভাষাটাকে এমন হেলাফেলা কেন! সব কিছুকে বাংলা নামে ডাকা যায় না। দরকারও নেই। ‘চেয়ার’, ‘টেবিল’, ‘কাপ’, ‘ডিস’ যেমন আছে থাক না। ‘বিদ্যুৎস্তম্ভ’ না বলে ‘ইলেকট্রিক পোস্ট’ বললেও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। কিন্তু খেতে বসে ‘মাম্মি একটু রাইস দাও না প্লিজ’ বলার মধ্যে কোথাও যেন অশিক্ষিত গাজোয়ারি আছে একটা। অসভ্যতা এবং সপ্রতিভতা (স্মার্টনেসও বলতে পারি স্বচ্ছন্দে) যে এক জিনিস নয় সেটা পরিষ্কার বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
চেতন ভগত, ঝুম্পা লাহিড়ী, বিক্রম শেঠ অবশ্যই পড়ব, পড়ে নিজেদের আর একটু বাড়িয়ে নেব আমরা; কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে শুধু ছবি স্ট্যাচু আর ২৫ শে বৈশাখের ছুটিতে চিনব কেন? কেন ভুলে যাব পথের পাঁচালী, হাঁসুলী  বাঁকের উপকথা, পুতুল নাচের ইতিকথা বা শ্রীকান্ত লেখা হয়েছে সেই ভাষায়, যে ভাষাটায় হামাগুড়ি দেওয়া শৈশবে আধো উচ্চারণে আমি প্রথম ‘মা’ ডাক ডেকেছিলাম। সুকুমার রায় যে খেলায় রসের ভাণ্ডার আমাদের জন্যে রেখে গেছেন তা বেখেয়াল থাকা মস্ত মূর্খামি। রাউলিং যখন হ্যারি পটারের জন্ম দেয়নি তার অনেক আগেই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় নামে একজন এই বাংলা ভাষাতেই গড়ে তুলেছেন এক আশ্চর্য জাদু পৃথিবী যার তুলনা বিশ্বসাহিত্য খুঁড়ে ফেললেও খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র জন্যে যেটুকু আবেগ-আয়োজন তার কণামাত্র কি আমরা দেখাতে পারি না এই দিনটার জন্যে? আর কিছু না হোক, শুভ বিজয়া, নিউ ইয়ার বা খুশির ঈদের মতো শুভেচ্ছা বিনিময় তো করতেই পারি। এই ভাষাটার জন্যেই তো একদল মানুষ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বন্দুকের সামনে। ধনদৌলত নয়, নারী বা কুর্সিও নয়; তাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন শুধু এই জন্যেই তাদের সন্তান-সন্ততি যে ভাষাটাতে প্রথম ‘মা’ ডেকেছে সেই ভাষাতেই আজীবন ডাকতে পারে যেন। আমাদের এই বিস্মরণ আত্মহত্যার মতো।

বাংলা ভাষা নিয়ে দুঃখবোধ

বহমান এ নষ্ট সময়ে

গোলাপ মুনীর
তারিখ: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
গত একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমী বইমেলায় এসেছিলেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, যিনি আমাদের সবার কাছে ভাষামতিন নামে সমধিক পরিচিত। স্বাভাবিকভাবেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ অতি দুর্বল শরীর নিয়ে এই বয়সে বইমেলায় তার আসাটা অনেকের নজর কেড়েছে, সাংবাদিকদের তো বটেই। মেলা প্রাঙ্গণে একজন ভাষাসৈনিক হিসেবে তার আজকের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বললেনÑ বায়ন্নর ভাষা আন্দোলনের সময় ভাবতেই পারিনি আমাদের বাংলা ভাষা এতটা সমৃদ্ধ। তখন ভাবতাম বাংলা ভাষার প্রকাশক্ষমতা ততটা নয়, যতটা আছে ইংরেজি ভাষার। ইংরেজি ভাষায় যেভাবে সব কিছু প্রকাশ করা যায়, বাংলা ভাষায় তা সম্ভব নয়। কিন্তু আজ দেখছি বাংলা ভাষায় সব কিছুই সুন্দরভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। এর প্রকাশক্ষমতা অসাধারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইংরেজিকেও হার মানায়। আমরা বাংলা ভাষার চর্চা যত বেশি করে করব এর প্রকাশক্ষমতা সম্পর্কে তত বেশি করে জানতে পারব।
তিনি যথার্থই বলেছেন। তবে আমার কাছে তার এই বক্তব্যের একটি বিশেষ দিক খুবই ভালো লেগেছে। বাংলা ভাষা নিয়ে তিনি একটি দাবি তুলেছেন, যা সচরাচর কেউ তোলেন না। দাবিটি হচ্ছে, বাংলা ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা, এমনকি ইংরেজির চেয়েও সমৃদ্ধ। এর প্রকাশক্ষমতা অসাধারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইংরেজিকেও হার মানায়। তার এই দাবিটি আমি আমার বছর দুয়েক আগের ‘সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার দলনমথন’ শীর্ষক এক লেখায় করেছিলাম। সে লেখায় সংবাদপত্রে বাংলা বানান নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল। সেখানে আমার দাবি ছিল, বাংলা ভাষা অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজির চেয়েও সমৃদ্ধ। এ দাবির সমর্থনে কিছুু উদাহরণও তুলে ধরেছিলাম। লেখাটি নয়া দিগন্তেই ছাপা হয়েছিল। লেখাটি অনেকের কাছে ভালো লেগেছিল, এমনটিই ফোন করে তারা জানিয়েছিলেন। লেখাটি লেখার সময় মনে হয়েছিল, বাংলা ভাষাকে ইংরেজির চেয়ে সমৃদ্ধ হিসেবে আমার দাবি করাটাকে অনেকে ধৃষ্টতা হিসেবে নিতে পারেন; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। হতে পারে, সেদিন এ দাবির সমর্থনে সে লেখায় আমার দেয়া উদাহরণগুলো এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমি আরেকটি দাবি করে থাকি : পৃথিবীতে যে কয়টি সমৃদ্ধ ভাষা আছে তার মধ্যে অন্যতম তিনটি হচ্ছে আরবি, বাংলা ও ইংরেজি। আর আরবি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা। এর শব্দভাণ্ডার যেন এক মহাসমুদ্র; তেমনি এর প্রকাশবৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। একটি আরবি শব্দের হ্রস্ব বা দীর্ঘ উচ্চারণ ব্যাপক অর্থপার্থক্য ঘটায়। এ ভাষা সম্পর্কে যাদের সামান্যতম জ্ঞান বা ধারণা নেই, তাদের পক্ষে এর সমৃদ্ধি কল্পনা করা অসম্ভব।
সে যা-ই হোক, আজ ভাষামতিনের মতো একজন গুণীজনের বক্তব্যে আমার একটি দাবির প্রতিফলন দেখতে পেয়ে ভালোই লাগছে। এর পরও আমার মনে হয়, এমন অনেককে এখনো পাওয়া যাবে যারা মনে করেনÑ বাংলা ভাষাকে ইংরেজির চেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা বলা ঠিক নয়। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, এ ধরনের ধারণা শুধু তারাই রাখেন যারা বাংলা ভাষার চর্চা থেকে নিজেকে বরাবর সরিয়ে রাখেন। তারা যদি বাংলা ভাষা ব্যবহারে সচেতন হতেন, তবে অনুধাবন করতে পারতেন বাংলা ভাষার বিচরণক্ষেত্র কত সমৃদ্ধ। একটি সমৃদ্ধ ডিগ্রি অর্জন যেমন ব্যাপক অধ্যয়ন ছাড়া সম্ভব নয়, তেমনি সমৃদ্ধ বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ব্যবহার-জগতে প্রবেশের জন্যও প্রয়োজন এ ভাষার ব্যাপক চর্চা। সে ধরনের চর্চায় যারা বিমুখ, তাদের কাছে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি কখনোই ধরা পড়বে না। কারণ, শুধু মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই ইসলাম সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন ছাড়া যেমনি ইসলাম সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি সম্ভব নয়, তেমনি বাঙালির ঘরে জন্ম নিলেই বাংলা ভাষা চর্চা ছাড়া এর সমৃদ্ধি অনুমান করা যায় না।
ব্যক্তিগতভাবে বাংলা ভাষা নিয়ে আমার বরাবরের একটা দুঃখবোধ আছে, বলা যায় নিত্য দুঃখবোধ। কারণ প্রতিদিন যখন রাজধানীর সড়কপথে চলি, তখন রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য সাইনবোর্ড দেখি। প্রচুর সংখ্যক সাইনবোর্ড চোখে পড়ে যেগুলোতে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। সাথে কেউ থাকলে এ নিয়ে কথা বলি। ভুল বানানটি ধরিয়ে দিয়ে শুদ্ধ বানানটি জানানোর চেষ্টাও করি। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত দুঃখবোধকে কিছুটা হলেও হালকা করার চেষ্টা করি। আমার মতো অনেকেই কোথাও ভুল বাংলা বানান ভুলভাবে লেখা দেখলে দুঃখ পান। প্রসঙ্গত একটি উদাহরণ দিতে চাই। ভারতীয় একটি ছায়াছবি দেখছিলাম। ছবিটি তৈরি হয়েছিল  দুর্ভিক্ষ নিয়ে। গ্রামের এক গরিব শিক্ষক দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়া তার এক নিকটজনের লাশ সামনে নিয়ে গেছেন সৎকারের জন্য। কিন্তু লাশের দীর্ঘ লাইন। বাধ্য হয়ে তাকে লাশ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় শ্মশানঘরে। অপেক্ষার সময় তিনি হঠাৎ  শ্মশানঘরের দেয়ালে ভুুল বানানে একটি লেখা দেখতে পেলেন। ভুল বানানটি দেখে স্বগোক্তির মাধ্যমে তার খেদ প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে উঠে গিয়ে হাত দিয়ে ঘষে ভুল বানানটি মুছে সেখানে ইটের টুকরা দিয়ে শুদ্ধ বানানটি লেখেন। এরপর লাশের পাশে ফিরে এসে লাশ সৎকারের অপেক্ষা করেন। মনে হচ্ছিল দেয়াল থেকে ভুুল বানানটি তাড়াতে পেরে সেদিন তিনি এক ধরনের তৃপ্তি বোধ করছিলেন। তাড়াতে পেরেছিলেন ভুল বানান দেখার দুঃখটুকু। আমাদের সমাজে বাংলা ভাষায় এমন দরদি মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সে য্ইা হোক, এ লেখায় কিছু বহুল প্রচলিত পীড়াদায়ক ভুলের ওপর আলোকপাত করতে চাই।
আমরা জানি, বেশ কয়েক বছর হলো আমাদের দেশের অনেক স্কুলে কলেজ শাখা খোলা হয়েছে। এসব স্কুলের সাইনবোর্ডে স্কুলের নামের শেষে এখন school and college শব্দত্রয় লেখা থাকে। কিন্তু গোল বাধে তখন, যখন সাইনবোর্ডটি লেখা হয় বাংলায়। কেউ লেখেন ‘স্কুল এন্ড কলেজ’। আবার কেউ লেখেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। আমাদের কাছে স্বীকৃত যে, প্রতিবর্ণীকরণের নিয়মটি রয়েছে, সে মতে এখানে এন্ড লিখলে ভুল হবে, শুদ্ধ বানানটি হবে অ্যান্ড। কারণ আমরা এখানে ইংরেজি and শব্দটির প্রতিবর্ণী করা বানানটি লিখছি, লিখছি না ইংরেজি end শব্দের প্রতিবর্ণীত বানানটি। বাংলা একাডেমী যে প্রতিবর্র্ণীকরণের নিয়মটি এখন মেনে চলে, সে অনুযায়ী সাধারণত ইংরেজি e-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হচ্ছে এ। আর ইংরেজি a-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হচ্ছে অ্যা। তাই ইংরেজি and বানানটি বাংলায় লিখতে গিয়ে লিখতে হবে অ্যান্ড, আর end বানানটি লিখতে হলে লিখতে হবে এন্ড। তাই যেসব স্কুলের সাইনবোর্ডে ‘স্কুল এন্ড কলেজ’ লেখা আছে, তারা ভুল করছেন। আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের একটি ভুল বানানে সাইনবোর্ড লেখা হবে, তা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। তাই আজকের এই লেখার মাধ্যমে সেই সব স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান রইলÑ যাদের সাইনবোর্ডে এখনো এই ভুল বানানটি রয়েছে, আর দেরি না করেই তা শুদ্ধ করে নিন। বছর দেড়েক আগে রাজধানী ঢাকার একটি নামকরা স্কুলের সাইনবোর্ডে এ ধরনের ভুল দেখে প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করে তাকে ভুল বানান দূর করার অনুরোধ জানাই। তিনি দ্রুত এই সাইনবোর্ড সরিয়ে বানান শুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আরো উন্নত মানের একটি সাইনবোর্ড তার স্কুলে টানান। তা ছাড়া নগরীতে অসংখ্য সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে কোনো কোম্পানির নামের শেষে ইরেজি and company শব্দযুগল যুক্ত রয়েছে। এসব সাইনবোর্ডেও বাংলায় শুদ্ধ বানান ‘অ্যান্ড কোম্পানি’ না লিখে অনেকেই প্রায়ই লিখে থাকেন ‘এন্ড কোম্পানি’। আমরা প্রতিবর্ণীকরণের নিয়ম অনুসরণ না করে স্বেচ্ছাচারীভাবে অনেক সুপ্রচলিত ইংরেজি শব্দের ভুল বাংলা বানান অহরহ লিখে চলেছি। যেমন শুদ্ধ বানান মেডিক্যাল না লিখে লিখছি মেডিক্যাল। অ্যাডভোকেট না লিখে লিখছি এডভোকেট। অ্যাকাডেমি না লিখে লিখছি একাডেমি বা একাডেমী। ব্যাঙ্ক না লিখে লিখছি সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ভুল বানান ব্যাংক। সাধারণ যুক্তি দিয়েও সহজেই বোঝা যায়Ñ কেন মেডিক্যাল নয়, মেডিক্যাল বানানটি শুদ্ধ। সাধারণত আমরা বলার সময় কেউ বলি মেডিক্যাল, আবার কেউ বলি মেডিকাল। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক এখনো বরাবর এই বানানটি লিখতে মেডিক্যাল লিখে থাকে। ঠিক তেমনি আরেকটি দৈনিক এই বানানটি লিখতে মেডিকাল লেখে। আসলে এই বানানটির শেষের অংশটি কেল বা কাল নয়, বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি ক্যাল হবে। যেমনি আরবি শব্দ দোয়াল্লিন বা জোয়াল্লিন না হয়ে বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি একটা উচ্চারণ করতে হবে। তা হলেই দোয়াল্লিন ও জোয়াল্লিন নিয়ে যে সমস্যা, তা কেটে যাবে। তেমনি শুদ্ধ বানান মেডিক্যাল বানানটি ব্যবহার করলে আমাদের মধ্যে কাটবে মেডিক্যাল না মেডিকাল লিখব সে সমস্যাও। আসলে ইংরেজি শব্দের কোনো কোনো অংশে আ-কার বা এ-কার উচ্চারণ না হয়ে বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি অ্যা উচ্চারিত হয়। সাধারণত ইংরেজি শব্দের যে স্থানে a  আছে সেখানে অ্যা উচ্চারণ হয়। তাই যথার্থ বানানটি হবে মেডিক্যাল, মেডিক্যাল বা মেডিকাল নয়।
ইংরেজি bank শব্দের বাংলা বানান ব্যাংক না হয়ে ব্যাঙ্ক হবে; ব্যাংক লেখা ভুলÑ এ দাবির পেছনে বাংলা ব্যাকরণভিত্তিক অনেক যুক্তিই রয়েছে। আপাতত এখানে দু’টি যুক্তি তুলে ধরার প্রয়াস পাবো। প্রথমত, আমাদের হাতে রয়েছে বাংলা বানানের সুপ্রসিদ্ধ বর্গীয় নিয়ম। নিয়মটি আমাদের শিখিয়েছেÑ দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ক-বর্গের প্রথম চার বর্ণ ক, খ, গ, ঘ বর্ণের আগে ঙ যোগ হবে, ং যোগ হতে পারবে না। এর ব্যতিক্রম দু’টি বানান : সংগঠন ও সংখ্যা। তা হলে বর্গীয় নিয়ম মেনে আমাদেরকে ব্যাংক না লিখে লিখতে হবে ব্যাঙ্ক। একই নিয়মে আমরা অংক না লিখে লিখব অঙ্ক।
এখানে এর আরেকটি ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করা খুবই জরুরি। সন্ধির একটা নিয়ম আছে, যাতে বলা আছে সন্ধির সময় ম-হসন্ত (ম্)-এর পর কোনো অর্থবোধক শব্দ যোগ হলে সন্ধি ঘটলে ম-হসন্তের স্থলে ং হবে। এটি সন্ধির একটি স্বীকৃত নিয়ম। এ নিয়ম অনুসারে সংগীত (সম্ + গীত), অলংকার (অলম্ + কার), সংকলন (সম্ + কলন), অহংকার (অহম্ + কার), সংকট (সম্ + কট), শংকর (শম্ + কর), সংকেত (সম্ + কেত), ভয়ংকর ( ভয়ম্ + কর), ঝংকার ( ঝম্ +কার) ইত্যাদি ধরনের বানান শুদ্ধ। আবার বানানের বর্গীয় নিয়মে সঙ্গীত, অলঙ্কার, সঙ্কলন, অহঙ্কার, সঙ্কট, শঙ্কর, সঙ্কেত, ভয়ঙ্কর, ঝঙ্কার ইত্যাদি বানানও শুদ্ধ। অতএব, এ ধরনের বানানগুলোর উভয় রূপ ব্যবহার সিদ্ধ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। এর যেকোনো একটি আমরা ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু ব্যাঙ্ক বা অঙ্ক এই শব্দ দু’টি উল্লিখিত সন্ধির নিয়মে পড়ে না। অতএব, কোনো অবস্থাতেই ব্যাংক বানানটি লেখার সুযোগ নেই, অপরিহার্যভাবে অবশ্যই লিখতে হবে ব্যাঙ্ক। অথচ দেশের প্রতিটি ব্যাঙ্ক স্বেচ্ছাচারের মতো ভুল বানানটি আঁকড়ে ধরে আছে। আজকাল বাংলা একাডেমীও অভিধানে ব্যাঙ্ক বানানটির পাশাপাশি ভুল বানানটি উল্লেখ করে বাংলা বানানে বিশৃঙ্খলাকেই বাড়িয়ে তুলছে।
Bank  শব্দের বাংলা বানান ব্যাঙ্ক হবে না ব্যাংক হবে, সে ব্যাপারে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় আনা যায় যথাযথ যৌক্তিক কারণে। উল্লেখ্য, এই বানানটির শেষে স্পষ্টতই nk  রয়েছে, যার উচ্চারণ কেবল ঙ্ক হওয়াই সম্ভব, ং হতে পারে না। কারণ ং-এর উচ্চারণটি হবে ইংরেজি ng-এর মতো। যেমন Bangladesh I English শব্দের ভেতরে থাকা ng-এর উচ্চারণ ং ধরে নিয়েই এই শব্দ দু’টির বাংলা বানান লিখি বাংলাদেশ ও ইংলিশ। ঠিক তেমনি bank, rank, tank  প্রভৃতি শব্দের ভেতরে থাকা nk-এর উচ্চারণ ঙ্ক ধরে নিয়ে এসব বানান বাংলায় যথাক্রমে লিখি ব্যাঙ্ক, র‌্যাঙ্ক ও ট্যাঙ্ক। লিখি না ব্যাংক, র‌্যাংক ও ট্যাংক। অতএব, প্রস্তাব রইল বাংলা একাডেমী যেন bank শব্দের প্রতিবর্ণী করা ভুল বানানটি অভিধান থেকে সরিয়ে নেয়। এখানে আরেকটি শব্দের কথা উল্লেখ করতে চাই। বাংলা ‘ব্যবসায়’ শব্দটির একটি কথ্য রূপ হচ্ছে ‘ব্যবসা’। ভারতের সংসদ অভিধানেও ব্যবসা শব্দটিকে ব্যবসায় শব্দের কথ্য রূপ হিসেবে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু আমাদের বাংলা একাডেমী অভিধানে ব্যবসা শব্দটি যে ব্যবসায় শব্দের কথ্য রূপ, তা উল্লেখ না করে শব্দ দু’টি পাশাপাশি লিখে কার্যত ব্যবসায় শুদ্ধ শব্দটির কবর রচনা করা হচ্ছে। ফলে অনেকে এই কথ্য রূপটিকেই শুদ্ধ রূপ বলে বিশ্বাস ও ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। গণমাধ্যমেও এর তেমন ব্যবহারই চলছে।
সবশেষে বলব, বাংলা ভাষার বানানশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জনসচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি এ ব্যাপারে সরকারের নজরদারিরও একটা তাগিদ আসে; যেমনÑ কোনো সাইনবোর্ড বা গণমাধ্যমে যাতে ভুল বাংলা বানান ব্যবহার না হয়, তার একটা তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমী প্রণীত প্রমিত বাংলা বানাননীতি যেমনি আমাদের মেনে চলতে হবে, তেমনি এর পাশাপাশি এর দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারেও আমাদের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সরলীকরণের নামে বাংলার প্রকাশক্ষমতাকে যেন আমরা সঙ্কুচিত করে না ফেলি। তেমনটি করা হলে কার্যত বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির ওপরই আঘাত হানা হবে। গণমাধ্যমের সচেতন ভূমিকাও এখানে অস্বীকার করার উপায় নেই।