আমারা বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে লিখতে ও বলতে চাই

Thursday, February 28, 2013

বাংলা ভাষা নিয়ে দুঃখবোধ

বহমান এ নষ্ট সময়ে

গোলাপ মুনীর
তারিখ: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
গত একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমী বইমেলায় এসেছিলেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, যিনি আমাদের সবার কাছে ভাষামতিন নামে সমধিক পরিচিত। স্বাভাবিকভাবেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ অতি দুর্বল শরীর নিয়ে এই বয়সে বইমেলায় তার আসাটা অনেকের নজর কেড়েছে, সাংবাদিকদের তো বটেই। মেলা প্রাঙ্গণে একজন ভাষাসৈনিক হিসেবে তার আজকের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বললেনÑ বায়ন্নর ভাষা আন্দোলনের সময় ভাবতেই পারিনি আমাদের বাংলা ভাষা এতটা সমৃদ্ধ। তখন ভাবতাম বাংলা ভাষার প্রকাশক্ষমতা ততটা নয়, যতটা আছে ইংরেজি ভাষার। ইংরেজি ভাষায় যেভাবে সব কিছু প্রকাশ করা যায়, বাংলা ভাষায় তা সম্ভব নয়। কিন্তু আজ দেখছি বাংলা ভাষায় সব কিছুই সুন্দরভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। এর প্রকাশক্ষমতা অসাধারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইংরেজিকেও হার মানায়। আমরা বাংলা ভাষার চর্চা যত বেশি করে করব এর প্রকাশক্ষমতা সম্পর্কে তত বেশি করে জানতে পারব।
তিনি যথার্থই বলেছেন। তবে আমার কাছে তার এই বক্তব্যের একটি বিশেষ দিক খুবই ভালো লেগেছে। বাংলা ভাষা নিয়ে তিনি একটি দাবি তুলেছেন, যা সচরাচর কেউ তোলেন না। দাবিটি হচ্ছে, বাংলা ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা, এমনকি ইংরেজির চেয়েও সমৃদ্ধ। এর প্রকাশক্ষমতা অসাধারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইংরেজিকেও হার মানায়। তার এই দাবিটি আমি আমার বছর দুয়েক আগের ‘সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার দলনমথন’ শীর্ষক এক লেখায় করেছিলাম। সে লেখায় সংবাদপত্রে বাংলা বানান নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল। সেখানে আমার দাবি ছিল, বাংলা ভাষা অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজির চেয়েও সমৃদ্ধ। এ দাবির সমর্থনে কিছুু উদাহরণও তুলে ধরেছিলাম। লেখাটি নয়া দিগন্তেই ছাপা হয়েছিল। লেখাটি অনেকের কাছে ভালো লেগেছিল, এমনটিই ফোন করে তারা জানিয়েছিলেন। লেখাটি লেখার সময় মনে হয়েছিল, বাংলা ভাষাকে ইংরেজির চেয়ে সমৃদ্ধ হিসেবে আমার দাবি করাটাকে অনেকে ধৃষ্টতা হিসেবে নিতে পারেন; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। হতে পারে, সেদিন এ দাবির সমর্থনে সে লেখায় আমার দেয়া উদাহরণগুলো এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমি আরেকটি দাবি করে থাকি : পৃথিবীতে যে কয়টি সমৃদ্ধ ভাষা আছে তার মধ্যে অন্যতম তিনটি হচ্ছে আরবি, বাংলা ও ইংরেজি। আর আরবি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা। এর শব্দভাণ্ডার যেন এক মহাসমুদ্র; তেমনি এর প্রকাশবৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। একটি আরবি শব্দের হ্রস্ব বা দীর্ঘ উচ্চারণ ব্যাপক অর্থপার্থক্য ঘটায়। এ ভাষা সম্পর্কে যাদের সামান্যতম জ্ঞান বা ধারণা নেই, তাদের পক্ষে এর সমৃদ্ধি কল্পনা করা অসম্ভব।
সে যা-ই হোক, আজ ভাষামতিনের মতো একজন গুণীজনের বক্তব্যে আমার একটি দাবির প্রতিফলন দেখতে পেয়ে ভালোই লাগছে। এর পরও আমার মনে হয়, এমন অনেককে এখনো পাওয়া যাবে যারা মনে করেনÑ বাংলা ভাষাকে ইংরেজির চেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা বলা ঠিক নয়। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, এ ধরনের ধারণা শুধু তারাই রাখেন যারা বাংলা ভাষার চর্চা থেকে নিজেকে বরাবর সরিয়ে রাখেন। তারা যদি বাংলা ভাষা ব্যবহারে সচেতন হতেন, তবে অনুধাবন করতে পারতেন বাংলা ভাষার বিচরণক্ষেত্র কত সমৃদ্ধ। একটি সমৃদ্ধ ডিগ্রি অর্জন যেমন ব্যাপক অধ্যয়ন ছাড়া সম্ভব নয়, তেমনি সমৃদ্ধ বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ব্যবহার-জগতে প্রবেশের জন্যও প্রয়োজন এ ভাষার ব্যাপক চর্চা। সে ধরনের চর্চায় যারা বিমুখ, তাদের কাছে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি কখনোই ধরা পড়বে না। কারণ, শুধু মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই ইসলাম সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন ছাড়া যেমনি ইসলাম সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি সম্ভব নয়, তেমনি বাঙালির ঘরে জন্ম নিলেই বাংলা ভাষা চর্চা ছাড়া এর সমৃদ্ধি অনুমান করা যায় না।
ব্যক্তিগতভাবে বাংলা ভাষা নিয়ে আমার বরাবরের একটা দুঃখবোধ আছে, বলা যায় নিত্য দুঃখবোধ। কারণ প্রতিদিন যখন রাজধানীর সড়কপথে চলি, তখন রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য সাইনবোর্ড দেখি। প্রচুর সংখ্যক সাইনবোর্ড চোখে পড়ে যেগুলোতে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। সাথে কেউ থাকলে এ নিয়ে কথা বলি। ভুল বানানটি ধরিয়ে দিয়ে শুদ্ধ বানানটি জানানোর চেষ্টাও করি। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত দুঃখবোধকে কিছুটা হলেও হালকা করার চেষ্টা করি। আমার মতো অনেকেই কোথাও ভুল বাংলা বানান ভুলভাবে লেখা দেখলে দুঃখ পান। প্রসঙ্গত একটি উদাহরণ দিতে চাই। ভারতীয় একটি ছায়াছবি দেখছিলাম। ছবিটি তৈরি হয়েছিল  দুর্ভিক্ষ নিয়ে। গ্রামের এক গরিব শিক্ষক দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়া তার এক নিকটজনের লাশ সামনে নিয়ে গেছেন সৎকারের জন্য। কিন্তু লাশের দীর্ঘ লাইন। বাধ্য হয়ে তাকে লাশ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় শ্মশানঘরে। অপেক্ষার সময় তিনি হঠাৎ  শ্মশানঘরের দেয়ালে ভুুল বানানে একটি লেখা দেখতে পেলেন। ভুল বানানটি দেখে স্বগোক্তির মাধ্যমে তার খেদ প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে উঠে গিয়ে হাত দিয়ে ঘষে ভুল বানানটি মুছে সেখানে ইটের টুকরা দিয়ে শুদ্ধ বানানটি লেখেন। এরপর লাশের পাশে ফিরে এসে লাশ সৎকারের অপেক্ষা করেন। মনে হচ্ছিল দেয়াল থেকে ভুুল বানানটি তাড়াতে পেরে সেদিন তিনি এক ধরনের তৃপ্তি বোধ করছিলেন। তাড়াতে পেরেছিলেন ভুল বানান দেখার দুঃখটুকু। আমাদের সমাজে বাংলা ভাষায় এমন দরদি মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সে য্ইা হোক, এ লেখায় কিছু বহুল প্রচলিত পীড়াদায়ক ভুলের ওপর আলোকপাত করতে চাই।
আমরা জানি, বেশ কয়েক বছর হলো আমাদের দেশের অনেক স্কুলে কলেজ শাখা খোলা হয়েছে। এসব স্কুলের সাইনবোর্ডে স্কুলের নামের শেষে এখন school and college শব্দত্রয় লেখা থাকে। কিন্তু গোল বাধে তখন, যখন সাইনবোর্ডটি লেখা হয় বাংলায়। কেউ লেখেন ‘স্কুল এন্ড কলেজ’। আবার কেউ লেখেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। আমাদের কাছে স্বীকৃত যে, প্রতিবর্ণীকরণের নিয়মটি রয়েছে, সে মতে এখানে এন্ড লিখলে ভুল হবে, শুদ্ধ বানানটি হবে অ্যান্ড। কারণ আমরা এখানে ইংরেজি and শব্দটির প্রতিবর্ণী করা বানানটি লিখছি, লিখছি না ইংরেজি end শব্দের প্রতিবর্ণীত বানানটি। বাংলা একাডেমী যে প্রতিবর্র্ণীকরণের নিয়মটি এখন মেনে চলে, সে অনুযায়ী সাধারণত ইংরেজি e-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হচ্ছে এ। আর ইংরেজি a-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হচ্ছে অ্যা। তাই ইংরেজি and বানানটি বাংলায় লিখতে গিয়ে লিখতে হবে অ্যান্ড, আর end বানানটি লিখতে হলে লিখতে হবে এন্ড। তাই যেসব স্কুলের সাইনবোর্ডে ‘স্কুল এন্ড কলেজ’ লেখা আছে, তারা ভুল করছেন। আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের একটি ভুল বানানে সাইনবোর্ড লেখা হবে, তা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। তাই আজকের এই লেখার মাধ্যমে সেই সব স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান রইলÑ যাদের সাইনবোর্ডে এখনো এই ভুল বানানটি রয়েছে, আর দেরি না করেই তা শুদ্ধ করে নিন। বছর দেড়েক আগে রাজধানী ঢাকার একটি নামকরা স্কুলের সাইনবোর্ডে এ ধরনের ভুল দেখে প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করে তাকে ভুল বানান দূর করার অনুরোধ জানাই। তিনি দ্রুত এই সাইনবোর্ড সরিয়ে বানান শুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আরো উন্নত মানের একটি সাইনবোর্ড তার স্কুলে টানান। তা ছাড়া নগরীতে অসংখ্য সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে কোনো কোম্পানির নামের শেষে ইরেজি and company শব্দযুগল যুক্ত রয়েছে। এসব সাইনবোর্ডেও বাংলায় শুদ্ধ বানান ‘অ্যান্ড কোম্পানি’ না লিখে অনেকেই প্রায়ই লিখে থাকেন ‘এন্ড কোম্পানি’। আমরা প্রতিবর্ণীকরণের নিয়ম অনুসরণ না করে স্বেচ্ছাচারীভাবে অনেক সুপ্রচলিত ইংরেজি শব্দের ভুল বাংলা বানান অহরহ লিখে চলেছি। যেমন শুদ্ধ বানান মেডিক্যাল না লিখে লিখছি মেডিক্যাল। অ্যাডভোকেট না লিখে লিখছি এডভোকেট। অ্যাকাডেমি না লিখে লিখছি একাডেমি বা একাডেমী। ব্যাঙ্ক না লিখে লিখছি সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ভুল বানান ব্যাংক। সাধারণ যুক্তি দিয়েও সহজেই বোঝা যায়Ñ কেন মেডিক্যাল নয়, মেডিক্যাল বানানটি শুদ্ধ। সাধারণত আমরা বলার সময় কেউ বলি মেডিক্যাল, আবার কেউ বলি মেডিকাল। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক এখনো বরাবর এই বানানটি লিখতে মেডিক্যাল লিখে থাকে। ঠিক তেমনি আরেকটি দৈনিক এই বানানটি লিখতে মেডিকাল লেখে। আসলে এই বানানটির শেষের অংশটি কেল বা কাল নয়, বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি ক্যাল হবে। যেমনি আরবি শব্দ দোয়াল্লিন বা জোয়াল্লিন না হয়ে বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি একটা উচ্চারণ করতে হবে। তা হলেই দোয়াল্লিন ও জোয়াল্লিন নিয়ে যে সমস্যা, তা কেটে যাবে। তেমনি শুদ্ধ বানান মেডিক্যাল বানানটি ব্যবহার করলে আমাদের মধ্যে কাটবে মেডিক্যাল না মেডিকাল লিখব সে সমস্যাও। আসলে ইংরেজি শব্দের কোনো কোনো অংশে আ-কার বা এ-কার উচ্চারণ না হয়ে বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি অ্যা উচ্চারিত হয়। সাধারণত ইংরেজি শব্দের যে স্থানে a  আছে সেখানে অ্যা উচ্চারণ হয়। তাই যথার্থ বানানটি হবে মেডিক্যাল, মেডিক্যাল বা মেডিকাল নয়।
ইংরেজি bank শব্দের বাংলা বানান ব্যাংক না হয়ে ব্যাঙ্ক হবে; ব্যাংক লেখা ভুলÑ এ দাবির পেছনে বাংলা ব্যাকরণভিত্তিক অনেক যুক্তিই রয়েছে। আপাতত এখানে দু’টি যুক্তি তুলে ধরার প্রয়াস পাবো। প্রথমত, আমাদের হাতে রয়েছে বাংলা বানানের সুপ্রসিদ্ধ বর্গীয় নিয়ম। নিয়মটি আমাদের শিখিয়েছেÑ দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ক-বর্গের প্রথম চার বর্ণ ক, খ, গ, ঘ বর্ণের আগে ঙ যোগ হবে, ং যোগ হতে পারবে না। এর ব্যতিক্রম দু’টি বানান : সংগঠন ও সংখ্যা। তা হলে বর্গীয় নিয়ম মেনে আমাদেরকে ব্যাংক না লিখে লিখতে হবে ব্যাঙ্ক। একই নিয়মে আমরা অংক না লিখে লিখব অঙ্ক।
এখানে এর আরেকটি ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করা খুবই জরুরি। সন্ধির একটা নিয়ম আছে, যাতে বলা আছে সন্ধির সময় ম-হসন্ত (ম্)-এর পর কোনো অর্থবোধক শব্দ যোগ হলে সন্ধি ঘটলে ম-হসন্তের স্থলে ং হবে। এটি সন্ধির একটি স্বীকৃত নিয়ম। এ নিয়ম অনুসারে সংগীত (সম্ + গীত), অলংকার (অলম্ + কার), সংকলন (সম্ + কলন), অহংকার (অহম্ + কার), সংকট (সম্ + কট), শংকর (শম্ + কর), সংকেত (সম্ + কেত), ভয়ংকর ( ভয়ম্ + কর), ঝংকার ( ঝম্ +কার) ইত্যাদি ধরনের বানান শুদ্ধ। আবার বানানের বর্গীয় নিয়মে সঙ্গীত, অলঙ্কার, সঙ্কলন, অহঙ্কার, সঙ্কট, শঙ্কর, সঙ্কেত, ভয়ঙ্কর, ঝঙ্কার ইত্যাদি বানানও শুদ্ধ। অতএব, এ ধরনের বানানগুলোর উভয় রূপ ব্যবহার সিদ্ধ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। এর যেকোনো একটি আমরা ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু ব্যাঙ্ক বা অঙ্ক এই শব্দ দু’টি উল্লিখিত সন্ধির নিয়মে পড়ে না। অতএব, কোনো অবস্থাতেই ব্যাংক বানানটি লেখার সুযোগ নেই, অপরিহার্যভাবে অবশ্যই লিখতে হবে ব্যাঙ্ক। অথচ দেশের প্রতিটি ব্যাঙ্ক স্বেচ্ছাচারের মতো ভুল বানানটি আঁকড়ে ধরে আছে। আজকাল বাংলা একাডেমীও অভিধানে ব্যাঙ্ক বানানটির পাশাপাশি ভুল বানানটি উল্লেখ করে বাংলা বানানে বিশৃঙ্খলাকেই বাড়িয়ে তুলছে।
Bank  শব্দের বাংলা বানান ব্যাঙ্ক হবে না ব্যাংক হবে, সে ব্যাপারে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় আনা যায় যথাযথ যৌক্তিক কারণে। উল্লেখ্য, এই বানানটির শেষে স্পষ্টতই nk  রয়েছে, যার উচ্চারণ কেবল ঙ্ক হওয়াই সম্ভব, ং হতে পারে না। কারণ ং-এর উচ্চারণটি হবে ইংরেজি ng-এর মতো। যেমন Bangladesh I English শব্দের ভেতরে থাকা ng-এর উচ্চারণ ং ধরে নিয়েই এই শব্দ দু’টির বাংলা বানান লিখি বাংলাদেশ ও ইংলিশ। ঠিক তেমনি bank, rank, tank  প্রভৃতি শব্দের ভেতরে থাকা nk-এর উচ্চারণ ঙ্ক ধরে নিয়ে এসব বানান বাংলায় যথাক্রমে লিখি ব্যাঙ্ক, র‌্যাঙ্ক ও ট্যাঙ্ক। লিখি না ব্যাংক, র‌্যাংক ও ট্যাংক। অতএব, প্রস্তাব রইল বাংলা একাডেমী যেন bank শব্দের প্রতিবর্ণী করা ভুল বানানটি অভিধান থেকে সরিয়ে নেয়। এখানে আরেকটি শব্দের কথা উল্লেখ করতে চাই। বাংলা ‘ব্যবসায়’ শব্দটির একটি কথ্য রূপ হচ্ছে ‘ব্যবসা’। ভারতের সংসদ অভিধানেও ব্যবসা শব্দটিকে ব্যবসায় শব্দের কথ্য রূপ হিসেবে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু আমাদের বাংলা একাডেমী অভিধানে ব্যবসা শব্দটি যে ব্যবসায় শব্দের কথ্য রূপ, তা উল্লেখ না করে শব্দ দু’টি পাশাপাশি লিখে কার্যত ব্যবসায় শুদ্ধ শব্দটির কবর রচনা করা হচ্ছে। ফলে অনেকে এই কথ্য রূপটিকেই শুদ্ধ রূপ বলে বিশ্বাস ও ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। গণমাধ্যমেও এর তেমন ব্যবহারই চলছে।
সবশেষে বলব, বাংলা ভাষার বানানশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জনসচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি এ ব্যাপারে সরকারের নজরদারিরও একটা তাগিদ আসে; যেমনÑ কোনো সাইনবোর্ড বা গণমাধ্যমে যাতে ভুল বাংলা বানান ব্যবহার না হয়, তার একটা তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমী প্রণীত প্রমিত বাংলা বানাননীতি যেমনি আমাদের মেনে চলতে হবে, তেমনি এর পাশাপাশি এর দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারেও আমাদের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সরলীকরণের নামে বাংলার প্রকাশক্ষমতাকে যেন আমরা সঙ্কুচিত করে না ফেলি। তেমনটি করা হলে কার্যত বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির ওপরই আঘাত হানা হবে। গণমাধ্যমের সচেতন ভূমিকাও এখানে অস্বীকার করার উপায় নেই।

No comments:

Post a Comment