আমারা বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে লিখতে ও বলতে চাই

Thursday, February 28, 2013

আকাশ পাতাল

বাংলা ভাষা

উল্লাস মল্লিক

আরও একটা চলে গেল। মানে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বড় চুপি চুপি, যেন মাথা হেঁট করে, চলে গেল। জানতেই পারল না অনেকে। যারা জানতে পারল, তারা বুঝতে পারল না এর গৌরবগাথা। আর যারা সম্যক বুঝল, তারা সংখ্যায় এত গুটিকয় মাত্র, তাদের সমবেত স্লোগান এত ক্ষীণ, যে বধির বাঙালির বন্ধকপাট খুলতেই পারল না। আমাদের মনে-মগজে কত তাবড় তাবড় ব্যাপার গুলতোল করে ঘাই দিচ্ছে অহর্নিশ! শেয়ার মার্কেটের উত্থান-পতন, আমেরিকার আগ্রাসন, পাকিস্তানের সঙ্গে রাগ-অনুরাগ, নতুন গ্রহে প্রাণের সন্ধান – কত সব প্রলয়কারী কাণ্ড! সঙ্গে পার্কস্ট্রিট কেলেঙ্কারি, সচিনের অফ ফর্ম, দীপিকা পাডুকোনের বিরহ – সব কিছুর এমন প্রবল সাইক্লোন, যে এই দুয়োরানি দিবসটা খড়কুটোর মতো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
চারদিকে এখন ইংরেজির তুমুল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। সঙ্গে হিন্দির সঙ্গত। ইস্কুল-কলেজে, মাঠে-ময়দানে, বাসে-ট্রামে, দোকানে-বাজারে বাংলা বেচারা প্রাণপণে মুখ লুকোচ্ছে। কিছু কিছু জায়গা আছে, সত্যি বলতে কী, যেখানে বাংলা বলতে বুক কাঁপে। শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, কেতাদুরস্ত রেস্তোরাঁয় মনে হয় বাংলা বললে নির্ঘাত ঘাড় ধরে বের করে দেবে। মেট্রোর সিটে হাতে সস্তা ইংরেজি পেপার ব্যাক ধরে থাকলে লোকে আড়াই ইঞ্চি সরে বসে। দোকানে ঢুকে ইংরেজিতে দাম জিঞ্জেস করলে সেলসম্যান অন্য খদ্দের ছেড়ে পড়িমড়ি করে এগিয়ে আসে। না ইংরেজি জানা চরিত্রের একটা মস্ত কলঙ্ক – এমন বলছি না। বরং ভীষণ জরুরি একটা প্রয়োজন। বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু তার জন্যে মাতৃভাষাটাকে এমন হেলাফেলা কেন! সব কিছুকে বাংলা নামে ডাকা যায় না। দরকারও নেই। ‘চেয়ার’, ‘টেবিল’, ‘কাপ’, ‘ডিস’ যেমন আছে থাক না। ‘বিদ্যুৎস্তম্ভ’ না বলে ‘ইলেকট্রিক পোস্ট’ বললেও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। কিন্তু খেতে বসে ‘মাম্মি একটু রাইস দাও না প্লিজ’ বলার মধ্যে কোথাও যেন অশিক্ষিত গাজোয়ারি আছে একটা। অসভ্যতা এবং সপ্রতিভতা (স্মার্টনেসও বলতে পারি স্বচ্ছন্দে) যে এক জিনিস নয় সেটা পরিষ্কার বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
চেতন ভগত, ঝুম্পা লাহিড়ী, বিক্রম শেঠ অবশ্যই পড়ব, পড়ে নিজেদের আর একটু বাড়িয়ে নেব আমরা; কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে শুধু ছবি স্ট্যাচু আর ২৫ শে বৈশাখের ছুটিতে চিনব কেন? কেন ভুলে যাব পথের পাঁচালী, হাঁসুলী  বাঁকের উপকথা, পুতুল নাচের ইতিকথা বা শ্রীকান্ত লেখা হয়েছে সেই ভাষায়, যে ভাষাটায় হামাগুড়ি দেওয়া শৈশবে আধো উচ্চারণে আমি প্রথম ‘মা’ ডাক ডেকেছিলাম। সুকুমার রায় যে খেলায় রসের ভাণ্ডার আমাদের জন্যে রেখে গেছেন তা বেখেয়াল থাকা মস্ত মূর্খামি। রাউলিং যখন হ্যারি পটারের জন্ম দেয়নি তার অনেক আগেই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় নামে একজন এই বাংলা ভাষাতেই গড়ে তুলেছেন এক আশ্চর্য জাদু পৃথিবী যার তুলনা বিশ্বসাহিত্য খুঁড়ে ফেললেও খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র জন্যে যেটুকু আবেগ-আয়োজন তার কণামাত্র কি আমরা দেখাতে পারি না এই দিনটার জন্যে? আর কিছু না হোক, শুভ বিজয়া, নিউ ইয়ার বা খুশির ঈদের মতো শুভেচ্ছা বিনিময় তো করতেই পারি। এই ভাষাটার জন্যেই তো একদল মানুষ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বন্দুকের সামনে। ধনদৌলত নয়, নারী বা কুর্সিও নয়; তাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন শুধু এই জন্যেই তাদের সন্তান-সন্ততি যে ভাষাটাতে প্রথম ‘মা’ ডেকেছে সেই ভাষাতেই আজীবন ডাকতে পারে যেন। আমাদের এই বিস্মরণ আত্মহত্যার মতো।

No comments:

Post a Comment